দি অ্যানিমেল

 

গল্প : দি অ্যানিমেল 
 
 
 
মো. ইয়াছিন
 
তিনটি খুনের আসামি হওয়া সত্ত্বেও আমাকে রাতের অন্ধকারে ছেড়ে দেওয়া হলো!
এই ঘটনার পেছনে যে বিশেষ কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে তা আমি আন্দাজ করতে পারছি। কারণ আমাকে বের করে দেওয়ার সময় জেলার আসলাম বলেছেন, "পেছনে কোনো শব্দ পেলে ফিরে তাকাবি না। সোজা হেঁটে চলে যাবি।"
এটা যেমন আশ্চর্যজনক ব্যাপার তেমনি আরো একটি আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, আমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। তাহলে মাত্র এক বছর জেল খাটার পর হঠাৎ আজ রাতে ছেড়ে দেওয়া হলো কেন? কী রহস্য লুকিয়ে আছে এর পেছনে? কেনই বা রাতের আঁধারে ছেড়ে দিলো ওরা?
এসব প্রশ্ন যেমন আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল তেমনি আরো একটি বিষয় কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছিলাম না। সেটা হচ্ছে, জেলার আসলাম কেন আমাকে পেছনে শব্দ পেলে ফিরে তাকাতে নিষেধ করেছেন? এর দ্বারা কী ইঙ্গিত করেছেন তিনি? কীসের শব্দই বা সেটা?
ভাবতে ভাবতে পাঁচ মিনিট ধরে হাঁটছি আমি। এটা শহরের মূল সড়ক। এখন সময় হবে বেশি হলে রাত বারোটা। অবাক করার মতো বিষয় হলো, রাত ঘনিয়ে আসার আগেই পুরো রাস্তা ফাঁকা। রাস্তায় মানুষ আর যানবাহন তো দূর, একটা কাকপক্ষীরও দেখা নেই। অবাক হয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখি, যতগুলো ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে কোথাও কোনো বাড়িতে আলো জ্বলছে না। তাই দেখে আমার একটু সন্দেহ হলো। আজ থেকে এক বছর আগে আমি যখন বাইরে ছিলাম তখন রাত তিনটার সময়ও এ-রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত। কেউ জেগে থাকুক বা না থাকুক আশপাশের প্রায় সব বাড়িতে সারা রাত আলো জ্বলত। কিন্তু এই এক বছরে কী এমন হয়ে গেল যার জন্য সবাই রাত বারোটার মধ্যেই বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে?
কৌতূহলে আরো একটু সতর্ক হলাম আমি। হঠাৎ আমার মনে হলো যেন চারপাশের বাড়িঘরগুলো ফাঁকা! কোথাও কেউ নেই। সবাই পালিয়ে গেছে। কৌতূহল মেটাতে একটা বাড়িতে হানা দিলাম। প্রথমে ভদ্রলোকের মতো দরজায় টুকা দিয়েছি। কেউ সাড়া দেয়নি। খানিক পর অন্য একটা বাড়িতে, অন্য একটা ঘরের দরজায় গিয়ে ডেকেছি। কিন্তু সাড়াশব্দ পাইনি। আস্তে আস্তে আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। আমি খুব জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তখন একটা বাড়ির গেট ধাক্কাতে গিয়ে দেখলাম, বাড়ির গেটে তালা ঝুলছে। তার মানে সত্যি সত্যি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে লোকজন!
আমি দৌড়ে গেলাম অন্য বাড়িতে, অন্য ঘরে, অন্য দরজায়। সবগুলো বন্ধ, সব দরজায় তালা। কোথাও কোনো মানুষ নেই। অন্ধকার চারপাশটা জনশূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে।
এজন্যই দিনদিন জেলখানায় আসামির সংখ্যা কমে যাচ্ছিল! এজন্যই প্রতিদিন সাজা শেষ হওয়ার আগেই আসামিদেরকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিল! এজন্যই কোনো আসামিকে বাইরের লোকজনের সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছিল না! যাতে তারা বাইরে খবর জানতে না পারে! কিন্তু এর পেছনের রহস্য কী? কেনই বা পুরো শহরটা এমন ফাঁকা হয়ে গেল? কী কারণে শহরের চিত্র এতটা বদলে গেল? আর কেনই বা জেলার আসলাম আমাকে বললেন, "পেছনে কোনো শব্দ পেলে ফিরে তাকাবি না। সোজা হেঁটে চলে যাবি।"
প্রশ্নে প্রশ্নে আমার মাথা ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ একটা মচমচ আওয়াজ পাই। অনেকটা শুকনো পাতায় পা ফেলার মতো শব্দ। সেই মচমচ আওয়াজটা যেন পেছন থেকেই এল! ব্যাপারটা পরিষ্কার হতেই আমার বুক হিম হয়ে গেল। সারা গা কাঁপুনি দিয়ে উঠল দু'বার। তারপর আরো একবার ওই একই শব্দ। আশপাশ এতটাই নিঃস্তব্ধ যে সেই মচমচ শব্দটা আমি স্পষ্ট শুনলাম। তার ঠিক পরেই জেলারের বলা কথামতো এগোতে লাগলাম। কিন্তু শব্দটা ততক্ষণে আমার পিছু নিতে শুরু করেছে। আমার কান বলছে, একটা চতুষ্পদ প্রাণী আমার পিছু নিয়েছে। আমি যত দ্রুত হাঁটছি সেটাও ঠিক ততটাই দ্রুত এগিয়ে চলছে। আমি থেমে গেলে সেটাও থেমে যাচ্ছে!
হাঁটতে হাঁটতে একটা উঁচু দেয়ালের সামনে চলে এসেছি। এরপর আর রাস্তা নেই। সামনের দেয়ালটা প্রায় ছয় ফুট উঁচু। সেটা পেরোতে গেলে দেয়াল বাইতে হবে। এদিকে আমি থেমে যেতেই পেছনের চতুষ্পদ প্রাণীটাও থেমে গেছে। মনে হচ্ছে এখনি আমার বিপদ হতে চলেছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেয়াল টপকাব। কিন্তু লাফ দিতে গেলেই যদি পেছনের প্রাণীটা হামলা করে বসে তখন?


----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------




দীর্ঘ একটি বছর জেলখানায় বন্দিদশায় জীবন কাটিয়েছি আমি। সেই এক বছরের মধ্যেই কিছু একটা হয়েছে। এবং সেই পরিবর্তনটুকু যে কিছুদিন আগে হয়েছে তা-ও আমি পরিষ্কারভাবে আন্দাজ করতে পারছি। কারণ আমাকে জেলে বন্দি করার পর প্রথম আট-ন' মাস সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। আজ থেকে প্রায় দু'মাস আগে এক রাতে আমার সাথের একজনকে রাতের অন্ধকারে ডেকে নেওয়া হলো। সেই লোকটাও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিল। অথচ সেই রাতের পর লোকটা আর ফিরে আসেনি। তিন-চারদিন পর আরো একটি লোককে ঠিক একইভাবে ডেকে নেওয়া হলো। তাকেও দ্বিতীয়বার দেখার সুযোগ হয়নি। মানুষগুলোকে কেন ডাকা হয়েছে, তাদেরকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেনই বা তাদের ডাক পড়েছে সেসব কেউই জানে না।
তৃতীয়বার যখন কাউকে ডাকতে দেখলাম তা-ও রাত বারোটায় তখন আমার একটু সন্দেহ হলো। ততক্ষণে আমি অনুধাবন করতে পারছি যে, এত রাতে ডেকে নিয়ে আসামি গায়েব হয়ে যাওয়াটা মোটেও স্বাভাবিক কিছু নয়। বরং এর পেছনে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো রহস্য আছে। বলা বাহুল্য, আমাদের মধ্যে থেকে কাউকে যখন ডেকে নেওয়া হত তখন কারোর নাম ধরে ডাকা হত না। জেলখানার পাহারাদার আসত। অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর যে-কাউকে উদ্দেশ্য করে বলত, "এই, এদিকে এসো।"
সেই মানুষটাকে নিয়ে যাওয়া হত ঠিকই। তবে সে আর ফেরত আসত না। এটা হচ্ছে প্রথম রহস্য। সেইসঙ্গে আরো একটি রহস্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমরা যা খাবার পেতাম, তা বাংলাদেশের জেলখানার স্বাভাবিক খাবারের সাথে হুবহু মিল। কিন্তু মানুষ গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে শুরু করার পর থেকে খাবারে বিশেষ পরিবর্তন আসলো। শক্ত রুটি আর পাতলা ডালের বদলে শুকনো খাবার দেওয়া শুরো হলো। কোনোদিন বনরুটি আর কলা, কোনোদিন ড্রাইকেক, বিস্কিট, কোনোদিন চিঁড়া-মুড়ি-গুড়, কোনোদিন ফল। গত কয়েকটা দিনে রান্না করা খাবার খুব কম দিনই খেয়েছি। সবচে' বড়ো কথা হলো, আমরা সকালের খাবার পেতাম দুপুর দুইটায় কিংবা তারও পরে। কোনোদিন আসর নামাজের পরেও খাবার পেয়েছি। তবে যখনই পাই, প্রতিদিন সেই একবেলা খাবার দেওয়া হত। সেই খাবার কেউ একবেলায় খেয়ে ফেলুক কিংবা জমিয়ে রেখে তিনবারে খাক সেটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার।
একদিন আমার সাথের একজন খুব কাতর হয়ে সেন্ট্রিকে বলল, "ভাই, আমার বউটা প্রেগনেন্ট ছিল। আন্দাজে এই মাসের কোনো একটা সময়ে বাচ্চা হওয়ার কথা। কিন্তু গত দুইমাস ধরে আমার বাড়ির কেউ দেখা করতে আসছে না। বাড়ির কোনো খবর আমি পাচ্ছি না। বউটা বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। শুনেছি, কারোর পরিবারের লোকজনই নাকি দেখা করতে আসছে না। এমনটা কেন হচ্ছে ভাই?"
"উপরতলার নির্দেশে জেলখানায় দেখাদেখি বন্ধ।"
"কেন ভাই? বন্ধ কেন?"
"নতুন নিয়ম।" সেন্ট্রি গম্ভীর। লোকটা কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, "আমার বউটার কেউ নাই। সে একা। এতদিনে বেঁচে আছে না মরে গেছে সেই খবরটাও আমি পাচ্ছি না। আমার মতো হতভাগা স্বামী মনে হয় দুনিয়ায় একটাও নাই।"
আমি বুঝলাম "নতুন নিয়ম"-এর আড়ালে কিছু একটা অনিয়ম হচ্ছে। কিছু একটা ঘটছে যা আমাদের বুঝতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের অজান্তে বিশেষ কিছু ঘটানো হচ্ছে যা আমরা জেলখানার চার দেয়ালে বন্দী অবস্থায় জানতে পারছি না এবং আমাদেরকে জানানোও হচ্ছে না।
এক রাতে হাঁপাতে হাঁপাতে এক পুলিশের লোক এল। তার পুরো শরীর ঘামে ভেজা। চোখদু'টো আতঙ্কে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা। গলায় জোর নেই তা-ও চেঁচিয়ে বলল, "একজন আসো। তাড়াতাড়ি আসো।" বলে আমাদের মাঝ থেকে একজনকে নিয়ে গেল। সেই মানুষটাও আর কোনোদিন ফিরল না। পরদিন যখন কাউকে ডেকে নিতে একজন সেন্ট্রি এল তখন আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম। সাফ জানিয়ে দিলাম, আগে বলতে হবে কীজন্য এবং কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর কেউ যাবে। সেকথা শুনে সেন্ট্রি রেগে আগুন। তাৎক্ষণিক ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলল,
"আজ তুই যাবি। আয় আমার সাথে।"
আমি রাজি হয়ে গেলাম। হাসিমুখে সেন্ট্রির সাথে চলতে লাগলাম। দেখা যাক কোথায় নিয়ে যায়? কেনই বা এত রাতে ডেকে নেয় আমাদের? কী করণে জেলখানায় এত পরিবর্তন? কেন বাইরের মানুষ ভেতরের কারোর সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না?
 
 
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 
 
 
 
 
সেন্ট্রির দুর্ব্যবহারে আমি ভেবেছিলাম অবস্থা খুব গরম হবে। হয়তো আমাকে খুব বাজেভাবে হেনস্তা করা হবে। মারধরও হতে পারত। কিন্তু আসল ঘটনা তা নয়। বরঞ্চ পরিবেশ খুব ঠান্ডা এবং থমথমে। জেলার আসলাম আমাকে দেখেই চেয়ার এগিয়ে দিলেন। আমার কাঁধে হাত দিয়ে চেয়ারে বসিয়ে নিচু আওয়াজে বললেন, "নাম কী তোর?"
যদিও তিনি আমার নাম জানেন তার পরও কী কারণে আবার জিজ্ঞেস করেছেন তা আমি আর জানতে চাইনি। এমনিতেই তাঁর আচরণে আমি হতবাক হয়ে আছি। সুতরাং সহজ ভাষায় নিজের নাম বললাম। তিনি মিয়নো গলায় জানালেন, "রাফিন? সুন্দর নাম। তুই দেখতেও খুব ভালো। আচরণও অন্যদের থেকে আলাদা। গুড বয়।" তারপর অন্যমনস্ক হয়ে প্রশ্ন করলেন, "খিদে আছে? কিছু খাবি?"
আমি বুঝতেই পারছিলাম না যে, আমাকে এতটা অবাক করে দিয়ে কী বোঝাতে চাচ্ছে ওঁরা? জেলার কখনো এমন হয়? নিজের চেয়ারে আসামিকে বসায়? এভাবে নিজের সন্তানের মতো করে খাবার খাবে কি না জিজ্ঞেস করে? অবশ্যই না। তাহলে এখন হচ্ছেটা কী? কেন এরা এতটা অন্যরকম আরচণ করছে?
যাকগে, একটু আগে বনরুটি আর কলা খেয়েছি বলেই ডানে বাঁয়ে মাথা নেড়ে জানালাম কিছু খাব না। কিন্তু জেলার মানতে নারাজ। বললেন, "তোর ইচ্ছেমতো খাবার খাওয়ানোর সাধ্য আমাদের নেই। তবুও ইচ্ছে পূরণ করার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। বল কী খাবি? আপেল খাবি? আমার এখানে অনেকগুলো আপেল আছে। আজই এখানে এসেছে। একদম তাজা। খাবি তুই?"
আপেলের প্রতি আমার আকর্ষণ নেই। তবুও "কী খাবি?" প্রশ্ন শুনেই চোখের সামনে একথালা ভাত ভাসছে। বহুদিন ভাত খাই না। সামান্য ভাত, আলুভর্তা, ডাল আর কাঁচা মরিচ পেলে একেবারে কনুই ডুবিয়ে খেতাম। সত্যিই আমার খুব ভাতের লোভ হতে লাগল। আমি বলেও ফেললাম, "ভাত পাওয়া যাবে?"
জেলার সহ সকলেই ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন আমার দিকে। সেন্ট্রি বলল, "ভাই রে, আমরাও অনেকদিন ভাত খেতে পাই না। তোমাদের মতো বেঁচে যাওয়া বনরুটি আর ফলমুল খেয়ে বেঁচে আছি।"
কথার মানেটা ধরতে পারি তার আগেই জেলার আমার হাতে দু'টো আপেল ধরিয়ে দিলেন৷ সেগুলো খেয়ে ফেললে আমাকে এগিয়ে দিলেন। আমাদের সঙ্গে সেন্ট্রিরাও এসেছে। ওদের কারো চোখে-মুখে আতঙ্ক, কারো চেহারায় ভয়। কেউ আবার দু'পা এগোয় তো এক পা পিছিয়ে যায় এমন।
মূল সড়কে উঠে এসে জেলার আমার হাত ধরলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই ব্লেড দিয়ে আমার হাতে টান দিতেই আমি আর্তনাদ করে কাটা অংশ চেপে ধরতে যাব তখন বললেন, "সামান্য কেটেছে। সেরে যাবে। তুই যা। আজ থেকে তোর ছুটি।"
আমি বললাম, "কিন্তু স্যার, আমি যাবজ্জীবন জেল খাটার কথা।"
"ব্যাপার না। তুই যা।" শ্বাস ছেড়ে বললেন, "তোর কপালটা খুব খারাপ। এক বছর আগে মিথ্যা মামলায় জেলে ঢুকেছিলি। অকারণে এতদিন শাস্তি ভোগ করেছিস। এখন আবার... তোর কপালটা সত্যিই খুব খারাপ। যাহ্, চলে যা। সোজা হাঁটা দিবি। পেছনে কোনো শব্দ পেলে ফিরে তাকাবি না। সোজা হেঁটে চলে যাবি।"
এই মুহূর্তে প্রায় ছ' ফুট উঁচু দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি জেলার কেন আমার হাত কেটেছিলেন। যাতে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চতুষ্পদ প্রাণীটা রক্তের গন্ধ শুঁকে সহজেই আমাকে খুঁজে বের করে নিতে পারে। তাহলে এটা কি কোনো মাংসাশী প্রাণী? এই প্রাণীর ভয়েই কি সবাই শহর ছেড়েছে? এটার ভয়েই কি সবাই বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে? তাহলে কি এতদিন জেলখানার আসামিরা এই প্রাণীর খাদ্য হচ্ছিল? না কি অন্য কোনো রহস্য? কিন্তু আমি যে স্পষ্ট টের পাচ্ছি, আমার পেছনে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। সেটার গলা দিয়ে গড়গড় গড়গড় শব্দ হচ্ছে। শব্দটা এতই তীক্ষ্ণ যে আমার কানে হাত দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু নড়লেই যদি প্রাণীটা হামলা করে বসে, এই ভেবে নড়ছি না। শক্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছি। পেছনের প্রাণীটা স্লথ গতিতে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। একটা বিশাল ছায়া পড়েছে দেয়ালের উপর। সেই ছায়াটা একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে। একটু একটু করে বাড়ছে। তাহলে কি এখানেই আমার জীবনের ইতি ঘটবে? কে জানে!
 
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 
 
 
মানুষ বিহীন আস্ত একটা শহর।
একটা নিস্তেজ, থেমে যাওয়া অসুস্থ শহর। সেই শহরের বুকে নেমেছে গাঢ় অন্ধকার রাত। কালো আকাশের বুকের ভেতর থেকে চাঁদটা খুব করে উঁকি দিতে চাইছে। সেই চাঁদের ছোপ ছোপ আলো এসে পড়েছে শহরের গায়ে। সোলার প্যানেলের শক্তিতে রাস্তার পাশের দু'-একটা বাতি দুর্বল আলো দিচ্ছে বা দিচ্ছে না। এমনই এক পার্থির চিত্র এঁকে নিয়েছে আমার মানব মস্তিষ্ক। সংগত কারণেই কিছু "কোশ্চেন মার্ক" সামনে চলে আসছে। কিছু এলোমেলো প্রশ্ন বারবার ভাবিয়ে তুলছে। বিটিভির শিরোনামের মতো পুনঃপুন ঘুরে ঘুরে চোখের সামনে আসছে। টেলিভিশনের অ্যাডের মতো করে বলছে, "আপনি কি জানেন..."
অথচ আমি কিছুই জানি না। এত মানুষের উপেক্ষিত শহরের ব্যাকস্টোরি আমি একটুও জানি না। এজন্যই হয়তো শহরের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি ঘর, প্রতিটি ঘরের দরজা দাঁত খিঁচিয়ে বলছে, "কী রে হাঁদা? এখনও কিছু বুঝতে পারিসনি?"
আমার বাঁ পায়ের নিচে নরম কিছু একটা পড়ে আছে। সামনে দেয়াল হওয়ায় এবং পেছনে অজানা বিপদ ফাঁদ পেতে দাঁড়িয়ে আছে বলেই এতক্ষণ খেয়াল করিনি। এখন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই চোখ নিচে নামিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল আমার। অকস্মাৎ পুরো দেহ ঝাঁকানি দিয়ে উঠল। কারণ আমার বাঁ পায়ের নিচে একটা পচা গলা লাশ! সেটায় অসংখ্য পোকা কিলবিল করছে। এতক্ষণ টের পাইনি কিন্তু এখন নাকে একটা বিকট গন্ধ আসছে। মরা মানুষের বিভৎস গলা লাশ এবং সেটার অসম্ভব বাজে গন্ধে মুখ ভরে বমি এল। ইয়াক! অতঃপর লাশটার উপরেই একদলা বমি ছেড়ে দিলাম। বুকটা ধড়ফড় করছে আমার। কারণ পেছনের প্রাণীটা নড়ছে। অতি সন্তর্পণে নড়ছে সেটা। বাঘ যেমন শিকার করার আগে ঝিম ধরে, যেমন অতি সাবধানে গা নাড়ায় ঠিক তেমনিভাবে নড়ছে।
এক মিনিট পার হওয়ার আগে দ্বিতীয়বার বমি করলাম। তারপর হঠাৎই মাথাটা ঘুরে এল। ঝাপসা চোখে একবার পাক খেয়ে ধপ করে মাটিতে পড়ে গেলাম। ঠিক তখন একটা ইয়া বড়ো প্রাণী আমার মুখের কাছে নাক ঘষতে লাগল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে ঠিক করে দেখতে পারিনি। তবে এতটুকু বুঝতে পেরেছি যে, প্রাণীটা আকারে হাতির চেয়ে কোনো অংশে কম হবে না।
এরপর আমার জীবনে আরো একবার সকাল হবে, আমি আবারো ভোরের আলো দেখতে পাব এমনটা কল্পনাও করিনি। তবে কল্পনাকে হার মানিয়ে দিয়ে পরদিন সকালে আমি চোখ খুললাম। তাকিয়ে দেখি একটা বুড়ো তবে তাগড়া লোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে আছে। আমি নড়ছি দেখেই বুড়ো বিস্মিত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, "জীবিত মানুষ! আজব কান্ড! জীবিত মানুষ পেয়ে গেছি! জ্যান্ত মানুষ পেয়ে গেছি!"
তাঁর এক হাতে রিভলবার। অন্য হাতে বাইনোকুলার। মুখে মাস্ক এবং গলায় ঝুলছে একটা বুলেট রাখার ব্যাগ। তিনি আমার মুখের উপর ঝুঁকে বললেন, "মেজর জোবায়েদ হোসেন হিয়ার। গেড আপ।" বলে পিস্তলটা মুখে নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে বললেন, "পচা লাশের গন্ধে টিকে আছো কীভাবে? আমি আর দু'মিনিট এখানে থাকলে নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক করব।"
বলতে বলতে তিনি দ্রুত পায়ে মূল সড়কে উঠে গেলেন। আমি আলভোলার মতো চারপাশ দেখে নিলাম। সামনে পেছনে ডানে বাঁয়ে অসংখ্য বাড়িঘর খালি পড়ে আছে। মাঠ-ঘাট, রাস্তা সব ফাঁকা। দোকানপাট বন্ধ। বাড়িতে বাড়িতে তালা। রাস্তার পাশে ফেলে রাখা গাড়িগুলোতে ধুলো জমে অবস্থা খারাপ। পিচঢালা রাস্তায় কচি কচি ঘাস উঠেছে। অল্প অল্প চেনা অচেনা নানান জাতের গাছও আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই পথ দিয়ে বহুদিন কোনো গাড়ি চলে না। বহুদিন কোনো মানুষ হাঁটাচলা করে না। নিজেকে মেজর বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া তাগড়া বৃদ্ধ পেছন ফিরে তাকিয়ে ভরাট গলায় বললেন, "জলদি এসো।"
বলার ভঙ্গিতে মনে হলো তিনি কোনো আর্মি সৈন্যকে অর্ডার করছেন। আমি অতোটা না ভেবে তাঁকে ফলো করছিলাম। ঘোর কাটেনি বলে সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল। তাই কিছু জিজ্ঞেসও করিনি।
তিনি হঠাৎ একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন। রিভলবারটা সাটারে লাগানো তালার দিকে তাক করেই ঠাস করে গুলি ছুঁড়লেন। তালা খুলে গেল। তিনি ভেতরে ঢুকলেন। একটা মস্ত দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিস এখানে মজুদ আছে। চাইলে পুরো দোকানটাই লুট করা যায় কিন্তু ভদ্রলোক শুধু কিছু খাবার ব্যাগে ভরে বেরিয়ে এলেন।
বাসায় ঢোকার পর ভেতর থেকে মূল গেটে দু'টো তালা দিলেন তিনি। নিচতলা পুরোটা তালাবদ্ধ করে দোতলা পেরিয়ে তিনতলায় গেলেন। খাবারের ব্যাগ নামিয়ে রেখে বললেন, "কাল সারারাত তুমি বাইরে ছিলে?"
"হুম।" সংক্ষেপে সায় দিলাম।
"তারপরও বেঁচে আছো কীভাবে?" কৌতূহলে তিনি আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়লেন। আমি পুরো ঘটনা খুলে বললে তিনি লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললেন, "সামান্য কয়েক দিনের মধ্যে পুরো শহর মানব শূন হয়ে গেছে। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। যারা পালায়নি তারা জীবন দিয়েছে। দেশটা এখন মহা সঙ্কটে।" বলতে বলতে তাঁর চোখে-মুখে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে এল। তিনি শ্বাস ছেড়ে বললেন, "আমার বউ-বাচ্চারাও আমাকে একা ফেলে চলে গেছে। বিশ্বস্ত চাকর আকমল আলী একমাত্র সঙ্গী হিসেবে আমার সাথে ছিল, সে-ও কিছুদিন আগে আতঙ্কে পালিয়ে গিয়েছিল। গত পরশু তার পচা লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।"
তিনি কথা বলছিলেন এমন সময় বাড়ির গেটে ধুম করে শব্দ হলো। এক মুহূর্তের জন্য বাড়িটা কেঁপে উঠেছিল। তিনি আতঙ্কিত চোখে বললেন, "মাই গড! এরা তো দিনের আলোয় রাস্তায় বেরোয় না। তাহলে আজ পাগলামো করছে কেন?"
আরো একবার কেঁপে উঠল বাড়িটা। তিনি দ্রুত রিভলবারে বুলেট ভরতে ভরতে বললেন, "এটা অসম্ভব। এরা দিনের আলোয় রাস্তায় বেরোয় না। আজ কী হলো?" জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে ফের আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যা ভেবেছিলাম তাই। তিনটা একসাথে। এতগুলো বুলেট আমার কাছে নেই। কী হবে এখন? এরা রক্ত না দেখে শান্ত হবে না। কিছুতেই না।"
আমি হতবাক হয়ে আছি। এই এখন কী ঘটছে? কেন ঘটছে? এই ভদ্রলোক "এরা" বলতে কাদেরকে বুঝিয়েছেন? সেসবের কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু হা করে তাকিয়ে আছি।
বাড়িটা আরো একবার কেঁপে উঠল। যেন ভূমিকম্প হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, "এই, তুমি মুসলিম?"
"হুম।"
"কালেমা পড়ে নাও। যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।" তারপর জানালার বাইরে উঁকি দিয়ে বললেন, "গেট ভেঙে ফেলেছে। ভেতরে আসছে। তিনতলা থেকে লাফ দিতে হবে। আসো আমার সাথে। তাড়াতাড়ি আসো।"
বলে তিনি অন্য দিকের একটা ঘরে গিয়ে জানালা খুলেই আবার দুম করে বন্ধ করে দিলেন। আতঙ্কিত গলায় বললেন, "এদিকে আরো দুইটা! আজ এতগুলো একসাথে! ব্যাপার কী?"
ততক্ষণে আমার ঠোঁট-মুখ কাঁপতে শুরু করেছে। আতঙ্কে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। দিনের আলোয় কেউ এতটা ভয় পেতে পারে সেটা এই প্রথমবার অনুভব করছি আমি। কাঁপা কণ্ঠে জানতে চাইলাম, "কী হচ্ছে এসব?"
তিনি দ্রুত আমার মুখ চেপে ধরে বললেন, "শি-শ-শ-শ্!"
 
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 


ধুমধাম শব্দ করে দরজা ভেঙে ফেলা হয়েছে। খিক-খিক ধরণের অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে প্রাণীগুলো উপরে উঠে আসছে। ইতোমধ্যে তাদের একজন তিনতলায় উঠে এসেছে। এবার কাঠের দরজা ভেঙে ফেলতে পারলেই ভেতরে ঢুকে যাবে। মেজর জোবায়েদ অসহায় চোখে দরজাটার দিকে তাকালেন। শক্ত কাঠের দরজা। ভেতর থেকে লক করা আছে। তবে এটা চোখের পলকে উপড়ে ফেলা প্রাণীগুলোর জন্য ডালভাত। আমরা নির্ঘাত মারা পড়তে চলেছি। পালানোর সব পথ বন্ধ। এবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করার ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
দরজায় প্রথম ধাক্কাটা পড়তেই মেজর জোবায়েদ আমাকে হেঁচকা টান দিয়ে দেয়ালের কাছে নিয়ে গেলেন। জানালায় টানানো বিশাল পরদার আড়ালে আমরা গা ঢাকা দিলাম। তখনই বিকট শব্দে দরজা ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিশাল প্রাণী, যার পা দু'টো ব্যাঙের মতো, হাতদু'টো যেন মানুষের কঙ্কালের, মুখটা বর্ণনা করার মতো নয়। টকটকে লাল চোখদু'টো চঞ্চল। প্রাণীটা হাত ও পায়ের উপর ভর করে এগিয়ে এসে এই বিশাল ঘরের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক মানুষের মতোই সোজা হয়ে দাঁড়াল। চারপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। পুরো বাড়িটাই এখন নিঃস্তব্ধ। প্রাণীটা স্থির দাঁড়িয়ে কান পেতে রইল। কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় কি না সেটা শোনার চেষ্টা করল। আওয়াজ না পেয়ে ভীষণ রাগে টেবিলটা উলটে ফেলে দিলো। কাচের বাসনগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলল। দেয়ালে টানানো টেলিভিশনটা আছাড় মেরে মেঝেতে ফেলে দিলো। তারপরও যখন কাউকে পাওয়া গেল তা তখন চাপা গর্জনে ফেটে পড়ল।
গর্জনের আওয়াজ খুব বেশি উঁচু নয়। তবে খুব ধারালো। খা-আ-আ-খ-খা-আ-আ.. এরকম শব্দ তৈরি করে চেঁচাতে থাকল প্রাণীটা। তারপর পুরো ঘর ওলট পালট করে দিয়ে কাউকে না পেয়ে ধীরে ধীরে জানালার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। জানালার কাছে পাতলা পরদার আড়ালে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। সেটা কি টের পেয়ে গেছে!
ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে এল।
প্রাণীটা এদিকেই আসছে। সতর্ক পা ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমরা নিরুপায় হয়ে মৃত্যুর কাছে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রাণীটা খুব কাছে এসে পরদায় নাক লাগিয়ে শুঁকতে লাগল। এপাশে আমরা। ওপাশে প্রাণীটা। মাঝখানে পাতলা পরদা। এতটা কাছাকাছি আসার পরও বোকা প্রাণী আমাদেরকে টের পায়নি। গন্ধ শুঁকে নিয়ে ফের ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর আরো অনেক্ষণ দাপাদাপি করল। সেটা যখন ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তখনও মেজর জোবায়েদ নড়লেন না। কিছু বললেন না। পাঁচ মিনিট কেটে যাওয়ার পরেও না। দশ মিনিট পরেও না।
প্রায় কুড়ি মিনিট পর তিনি পরদার আড়াল থেকে বেরিয়ে বাইনোকুলার হাতে তুলে নিলেন। জানালার বাইরের দিকটা দেখে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আমি তাঁর পিছু পিছু ছাদে গেলাম। তিনি বাইনোকুলারে চোখ রেখে অবাক গলায় বললেন, "মাই গড!"
বাইনোকুলারটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, "দ্যাখো!"
আমি দেখলাম অনেক দূরে অদ্ভুত প্রাণীগুলো জড়ো হয়েছে। বললাম, "এরা মিটিং করছে?"
মেজর আমার হাত থেকে বাইনোকুলারটা কেড়ে নিয়ে ফের সেটাতে চোখ রাখলেন। দূরের দৃশ্যটা দেখতে দেখতে বললেন, "এদের একজন মারা গেছে। মৃত সদস্যকে ঘিরে শোক পালন হচ্ছে। এজন্যই আজ এরা দিনের আলোয় এতটা তান্ডব চালিয়েছে। এরপর এরা থামবে না। নিশ্চয়ই আজ রাতে এরা সাধারণের তুলনায় অন্তত দশ গুণ বেশি হিংস্র হয়ে উঠবে।"
"কিন্তু এই প্রাণীগুলো কোথা থেকে এসেছে? এদের নামটাই বা কী? আগে কখনো তো দেখিনি।"
"আগে দ্যাখোনি, এখন দেখে নাও। সবকিছু তো তোমার সামনেই ঘটছে।"
"কিন্তু এগুলো কোত্থেকে এল? আর শহরের চেহারাই বা এতটা পালটে গেল কেন?"
"পাল্টে যাওয়াটাই যে দরকার। সবকিছুই যে পাল্টে যায়। অন্তত কোয়ান্টাম মেকানিক্স তো সেটাই বলে। বিজ্ঞানের এই এক বিশেষ শাখা, যেখানে বলা আছে, ভবিষ্যৎ কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না। প্রকৃতি কিছু বিষয় নিজের কাছে রেখে দেয়। কিছুতেই সেসব আগেভাগে জানতে দেয় না।" বলে তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। অভিজ্ঞ গলায় বললেন, "এই যে আমাকে দেখছো, কিংবা এই যে আমার হাতের এই দূরবীনটা দেখছো। এইসব প্রতি মুহূর্তে পরিরর্তন হচ্ছে। সবকিছুর রং, আকার, আয়তন, ওজন পরিবর্তন হচ্ছে। এখন তুমি যা দেখছো, এক সেকেন্ড পর সেই চিত্রটা আর আগের মতো দেখতে পারবে না। কারণ ততক্ষণে দৃশ্যটা পুরোপুরি বদলে গেছে। যদিও খালি চোখে সেসব বোঝা সম্ভব নয়।"
থামলেন। আমি বললাম, "কিন্তু এরা কী করতে এই শহরে এসেছে?"
"বদলা নিতে এসেছে।"
"বদলা? কীসের বদলা?"
"প্রকৃতির বদলা। এবার প্রকৃতি নিজেই নিজের বদলা নেবে। প্রতিশোধ নেবে। এবং নিতে শুরু করেছেও। ভেবে দ্যাখো, একসময় ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল। সেসব বাদ দিয়ে যদি আরো কাছাকাছি কিছু চিন্তা করি তবে দেখতে পাব, গত একশো বছরে শহ হাজারো প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে, বহু পশু, বহু পাখি, বহু বৃক্ষ, বহু নদী, নালা, খাল, বহু পাহাড়, বন বিলুপ্ত হয়ে গেছে শুধু মানুষের কারণে। মানুষ নিজেদের জীবন উন্নত করতে গিয়ে প্রকৃতি ধ্বংস করে ফেলছে। গাছ কাটছে, বন উজার করে ফেলছে, প্লাস্টিকের ব্যবহার দিনদিন বাড়াচ্ছে, কলকারখানা বাড়ছে, পাথর তুলছে, বালি তুলছে, বড়ো বড়ো দালান করছে। সৌখিন নামধারী অসচেতন মানুষ সুস্বাদু পাখি খাওয়ার নাম করে রেস্টুরেন্টে বসে অতিথি পাখির মাংস খাচ্ছে। রেস্টুরেন্টওয়ালারা অতিথি পাখি মেরে মেরে রেঁধে দিচ্ছে। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা! আর কী চাই? তারপর মেডি ওয়েস্ট, ই ওয়েস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। সব পানিতে মিশছে। সমুদ্রের জলে যাচ্ছে। মানুষের এই অতি পাওয়ার সাধ পূরণ হচ্ছে ঠিকই, তবে তার পেছনে লোকসান হচ্ছে সমস্ত প্রাণীকুলের। প্রকৃতি হচ্ছে ধ্বংস। তাইতো সবকিছুর পর আজ মানুষ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একদিন হয়তো গোটা পৃথিবীতে দু'একজন ব্যতীত কেউই বেঁচে রইবে না। সেই দুই-একজনও থাকবে আফসোস করার জন্য। তারা তখন আফসোস করবে আর প্রকৃতির কাছে ক্ষমা চাইবে।"
নিঃশ্বাস ছাড়লেন তিনি। বিদ্ধস্ত গলায় বললেন, "এই প্রাণীগুলো পৃথিবীতে ছিল না। এদেরকে এভাবে তৈরি করা হয়েছে। এটা প্রকৃতির সাথে বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এজন্যই প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। আরো নেবে।"
"কিন্তু এরকম প্রাণী তৈরি করল কে?"
প্রশ্ন শুনে তিনি আগ্রহ দেখালেন। বললেন, "ড. অর্ণালের নাম শুনেছ?"
"সেই পাগল বিজ্ঞানী? যাকে স্ত্রী খুনের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছিল?"
"হুমম্। লোকটা মেন্টালি সিক। তা না হলে গবেষণার জন্য কেউ নিজের বউয়ের নাভিতে ক্ষতিকর পদার্থ ঢেলে দেয়?"
"লোকটা কি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিল?"
"হ্যাঁ। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে নিজের ঘরে সিক্রেট ল্যাব তৈরি করে সেখানে গবেষণা চালাতে থাকে। বিভিন্ন প্রাণীদের ডিএনএ স্যাম্পল জোগাড় করে কী একটা করছিল সে। হঠাৎ একদিন প্রেস কনফারেন্স ডেকে বলল সে নতুন এক জাতের প্রাণী আবিষ্কার করে ফেলেছে। সেই প্রাণীগুলো মানুষের কাজে আসবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রেজাল্ট পাল্টে যায়। একদিন রাতে সে ঘুমাচ্ছিল। তখন প্রাণীটা তার ধারালো নখ দিয়ে ড.-এর কলিজা ছিঁড়ে নেয়। দু'টো প্রাণী ছিল। একটা মেল আর একটা ফিমেল। সেই রাতে দু'টোই পালিয়ে গেল। ওরা তখন বিড়ালের সমান। মাসখানেক ওদের খোঁজ মিলল না। হঠাৎ একদিন একটা রেস্তোরাঁর সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ল, একটা গোরুর সমান প্রাণী হেঁটে যাচ্ছে। সিকিউরিটি গার্ড ঘুমাচ্ছিল। প্রাণীটা মুহূর্তের মধ্যেই সিকিউরিটি গার্ডের ওপর হামলা করে বসল। পরদিন গার্ডটাকে তো পাওয়া গেল। কিন্তু তার হৃদপিন্ডটা কেউ ছিঁড়ে নিয়ে গিয়েছিল।"
"পাগল বিজ্ঞানীটাই তাহলে সব নষ্টের মূল?"
"হুম।"
"আপনি এতসব জেনেছেন কীভাবে?"
"পেপার পত্রিকায় তা-ই এসেছে।"
"এরপর থেকেই শহরে তান্ডব? যার ফলে সবাই ভয়ে শহর ছেড়েছে?"
"হুম।"
"এতসব হয়ে যাচ্ছে, প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? পুলিশ, আর্মি এরা কীসের জন্য? আমাদের এত ভারী ভারী অস্ত্র কীসের জন্য?"
মেজর গম্ভীর গলায় বললেন, "তোমার কি মনে হচ্ছে তুমি হলিউডের কোনো সিনেমা দেখছো? যদি মনে হয়ে থাকে তবে সেটা এই মুহূর্ত থেকে ভুলে যাও। এটা কোনো সিনেমা নয় যে নায়ক আসলো। হেলিকপ্টার থেকে ধুমধাম গুলি ছুড়ল। তারপর শেষ। এটা রিয়েলিটি। আর রিয়েলিটিতে কিছু করতে গিয়ে অনেক কিছু বিবেচনা করে করতে হয়।"
"যেখানে মানুষরাই বেঁচে থাকতে পারছে না সেখানে কীসের বিবেচনা?"
"কে বলল বেঁচে থাকতে পারছে না? সমস্যাটা শুধু এই শহরেই। প্রাণীগুলো এখনও শহরের বাইরে কোথাও যায়নি। সুতরাং বাইরের সবাই সেফ।"
"তাই বলে এদেরকে প্রশ্রয় দেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? সবগুলোকে খতম করে দিলেই তো হয়।"
"হ্যাঁ, হয়। বিমান বা হেলিকপ্টার থেকে এলোপাতাড়ি ফায়ার করা যেতে পারে। বোম্পিং করা যেতে পারে। এতে কী হবে জানো? একে তো এই শহরটা ধুলোয় মিশে যাবে। আর দুই হচ্ছে এখানকার সব প্রাণীরা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। যে যেদিকে পারবে চলে যাবে। এতে করে পুরো দেশ হুমকির মুখে পড়তে পারে।"
"তাহলে এখন?"
"এখন কিছু না। ভাবতে হবে। আর ভাবার জন্য আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এই প্রাণীগুলো আজ রাতে খুব হিংস্র হয়ে উঠবে। তাই আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।"
"কীরকম প্রস্তুতি?"
"চলো আমার সাথে।"
"কোথায়?"
"বাইরে। কিছু জিনিসপত্র আনতে হবে।"
"কিন্তু প্রাণীগুলো যদি আবার হামলা করে?"
"সঙ্গে রিভলবার আছে।"
"আপনার কি মনে হয় এই ছোট্ট রিভলবার দিয়ে ওদের ঘায়েল করা সম্ভব?"
তিনি অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, "এ-ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এখন গিয়ে জিনিসপত্র এনে না রাখলে রাতে যখন ওরা হামলা করবে তখন কিছু করার থাকবে না। এরচে' চলো সময় থাকতে প্রস্তুতি নিয়ে নেই।"
"কিন্তু আপনি এতটা শিওর হচ্ছেন কীভাবে যে আজ রাতে ওরা হামলা করবে?"
মেজর গম্ভীর গলায় বললেন, "প্রাণীগুলো তোমাকে খুঁজতে এসেছিল। না পেয়ে চলে গেছে। তবে ওরা হার মেনে নেয় না কখনো। দিনের আলোয় চোখে কম দেখে বলে হাল ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু রাতে অবশ্যই আবার আসবে। তোমাকে নিয়ে যেতে আসবে।"
"আমাকে?"
মেজর অভিজ্ঞ গলায় বলল, "হ্যাঁ, তোমাকে। তুমি নিশ্চয়ই কিছু একটা আড়াল করছো। যা শুধু তুমি জানো আর ওই প্রাণীগুলো জানে। এজন্যই ওরা তোমাকে খুঁজতে এসেছিল।"
 
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 
 
 
মেজর জোবায়েদ যা বলেছিলেন তা সম্পূর্ণ ভুল।
তিনি বলেছিলেন, আমি তাঁর কাছ থেকে কিছু একটা আড়াল করছি। কোনো এক রহস্যময় কথা গোপন করছি। হয়তো ওই আজব প্রাণীগুলোর সাথে আমার কোনো এক ভাবে যোগসূত্র আছে যার জন্য প্রাণীগুলো আমাকে খুঁজতে এসেছিল৷ মেজর সাহেব হয়তো ধারণা করেছেন যে, আমি কোনোভাবে প্রাণীগুলোর কোনোরূপ ক্ষতি করেছি। যার বদলা নেওয়ার জন্যই সেগুলো পাগল কুকুরের মতো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আসলে মূল ঘটনা তা নয়। প্রাণীগুলো কিছু একটা খোঁজছিল ঠিকই, তবে সেটা আমাকে নয়। খোঁজছিল তাদেরই এক সঙ্গীর ছোটো বাচ্চাকে। একটা বাচ্চা প্রাণী আজ সকাল থেকে নিখোঁজ। সেটাকেই খোঁজছিল ওরা। ব্যাপারটা আমিও জানতে পারতাম না যদি না ওই বাচ্চা প্রাণীটা আমার চোখের সামনে না পড়ত।
আজ ভর দুপুরে যখন ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার এবং আত্মরক্ষার জন্য কিছু অস্ত্র জোগাড় করতে বেরিয়েছি তখনই বাচ্চাটাকে চোখে পড়ল। আমরা মূল রাস্তা ধরেই হাঁটছিলাম। আমার হাতে একটা লোহার পাইপ। আর মেজরের হাতে রিভলবার। তিনি আগে আগে হাঁটছিলেন। আমি পিছু পিছু। হঠাৎ কী মনে করে যেন রাস্তার ঠিক বাঁ দিকে যে সরু গলিটা চলে গেছে সেটার এক অংশে চোখ পড়ল আমার। দেখি অদ্ভুত প্রজাতির প্রাণীগুলোর মতোই দেখতে তবে আকারে ছোটো জন্তুটা ছোট্ট জলাশয়ের সামান্য পানিতে দাপাদাপি করছে। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে আবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। গড়াগড়ি খাচ্ছে। এগিয়ে এসে আবার পানির দিকে যাচ্ছে।
ততক্ষণে মেজর একটা বিশাল দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেছেন। আমি অতি সাবধানে এগিয়ে গেলাম। তবে মেজরের দিকে নয়, সেই ছোটো প্রাণীটার দিকে। প্রাণীগুলো দিনের আলোয় ঠিক করে চোখে দেখে না। ঝাপসা ঘোলাটে সাদামতো চিত্র টের পায় শুধু। আমি কাছে গিয়ে গা ছুঁয়ে দিতেই সেটা খরগোশের মতো নাক নাড়াতে নাড়াতে আমাকে শুঁকতে লাগল। আমি তার কান ছুঁয়ে দিলাম। তকতকে খসখসে কানটা আমার হাতের চেয়েও বড়ো। অন্য হাত দিয়ে ঘন লোমশ ঘাড় স্পর্শ করতেই প্রাণীটা আরামে আমার গায়ের উপর গা এলিয়ে দিলো। একটু সরে যেতেই গোঁত গোঁত শব্দ করে ঘাড়টা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো যাতে আরো আদর করি। ভাবতেই অবাক লাগছে যে, আজকের এই আদুরে বাচ্চা প্রাণীটাই ক'দিন পর হিংস্র হয়ে উঠবে। শহরে তান্ডব চালাবে। নির্দয়ের মতো মানুষ খুন করে বেড়াবে।
এই বাচ্চাটার কথা মেজরকে বলতে যাচ্ছিলাম। তখনই সেটা দুই লাফে এগিয়ে এসে আমার পিঠের উপর থুতনি ঘষতে লাগল। এর অর্থ সে আরো আদর চাইছে। কিন্তু এমন হিংস্র প্রাণীকে আদর দেওয়া কি ঠিক? এটার স্বজাতির চোখে পড়লে প্রাণে বাঁচা সম্ভব হবে না। এরচে' কোনো প্রকার অঘটন ঘটে যাওয়ার আগেই মেজরকে বলে দেওয়াই ভালো হবে। কিন্তু শেষমেশ আমি তা করতে পারলাম না। মেজরের সাথে রিভলবার আছে। তিনি এই প্রাণীটার কথা শুনলেই ছুটে এসে গুলি করে দেবেন। এটা আমি মানতে পারছি না। হঠাৎ কী কারণে যেন এই বাচ্চা প্রাণীটার প্রতি খুব মায়া হচ্ছে আমার।
এত বড়ো জন্তুকে লুকিয়ে রাখতে পারা কঠিন। এটা বয়সে বাচ্চা হলেও আকারে অনেক বড়ো। সোজা হয়ে দাঁড়ালে এর উচ্চতা আমার থেকে অল্প একটু কম। সুতরাং এটাকে লুকিয়ে রাখতে গিয়ে হাঁফ ধরে গেল। তবে পাবলিক টয়লেটে আটকে রাখতে পেরে শেষমেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। কেন জানি না প্রাণীটাকে মেজরের হাত থেকে বাঁচাতে পেরে খুব আনন্দ লাগছিল আমার। আমি জানি কিছুদিন পর এই প্রাণীটাই আমার বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হয়তো এই প্রাণীটা আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে এটার হিংস্রতা আমার চোখে পড়ল না। এ'র মাঝে একটা কোমল শিশুকেই দেখেছি আমি। তাইতো এটা যাতে মেজরের সামনে না পড়ে সেজন্য পাবলিক টয়লেটের ভেতরে লুকিয়ে রেখে এলাম। কিন্তু এই একটা সিদ্ধান্ত যে আমি জীবনের গতিপথ এতটা ঘুরিয়ে দেবে তা আমার জানা ছিল না।
মেজর একটা গ্যাসের চুলার দোকানে ঢুকেছেন। এই অসময়ে গ্যাসের চুলার কী দরকার তা বুঝে উঠতে পারিনি। ইতস্তত করে কিছু জিজ্ঞেস করব তার আগেই তিনি একটা গোপন দরজা আবিষ্কার করে ফেললেন! তাঁর হাতের ইশারায় দরজাটা ঢকঢক শব্দ করে খুলে গেল।
ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা ঘর। আকারে বিশাল ফাঁকা অন্ধকার ঘরটায় প্রবেশ করে টর্চ লাইটের আলোয় সুইচবোর্ড খুঁজে বের করলেন তিনি। আলো জ্বালিয়ে দিতেই ভেতরের দৃশ্য দেখে আমার চোখ ছানাবড়া! শহরের এই ছোট্ট গ্যাসের চুলার দোকানের আড়ালে এত বড়ো অস্ত্রাগার রয়েছে সেটা কে বিশ্বাস করবে!
বিশাল বড়ো ঘর। মাঝখানটা পুরোপুরি ফাঁকা। শুধু চারপাশের দেয়ালে নানান অস্ত্র সাজিয়ে রাখা। মামুলি রিভলবার থেকে শুরু করে স্নাইপার রাইফের, এ কে ফোরটি সেভেন, উজি, সাবমেশিন কোনোকিছুই বাদ নেই। সব আছে এখানে! মেজর একটা এ কে ফোরটি সেভেন, একটা উজি আর কিছু ম্যাগাজিন নিয়ে আমাকে সুযোগ দিলেন। আমি একটা মডেল না জানা পিস্তল নিলাম শুধু।
চলে আসার সময় যখন রাস্তার পাশের পাবলিক টয়লেটের কাছ দিয়ে আসছিলাম, তখন ছোটো প্রাণীটার গোঁত গোঁত শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সেটা ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, মেজর যদি টের পেয়ে যান তাহলে আর প্রাণীটাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। এতদিনের একাকী আতঙ্কিত জীবনের পুরো ঝাল তিনি এই বাচ্চা প্রাণীটার উপর মেটাবেন।
রাত তখন কত আমি জানি না। বাসার গেটটা সারিয়ে নেওয়া যায়নি। ঘরের দরজাগুলোও না৷ তাই মেজর সাহেব আমাকে নিয়ে অন্য একটা বাড়িতে উঠেছেন। প্রতিবেশিরা এ-বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় একটা ডুপলিকেট চাবি মেজর সাহেবের কাছে দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই চাবির সঠিক ব্যবহার করা হলো আজ। ভারী লোহার গেটে দু'টো তালা দিয়ে ঘরের মূল দরজায় আরো একটি তালা ঝুলানো হলো। সব ঘরের দরজা লাগিয়ে আমরা ডায়নিং রুমে বসে আছি। টেবিলের উপর ভারী অস্ত্র। আক্রমণ হলেই এলোপাথারি ফায়ারিং হবে।
অনেক্ষণ পরিবেশ ঠান্ডা থাকায় আমাদের দু'জনেরই একটু তন্দ্রার ভাব এসেছিল। তবে আমি সম্পূর্ণ সজাগ আছি। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, দিনের বেলায় একটা বাচ্চা প্রাণীকে পাবলিক টয়লেটে আটকে রেখেছিলাম। ভাবছি মেজর ঘুমিয়ে পড়লে আস্তে করে বেরিয়ে যাব। যে করেই হোক বাচ্চাটাকে মুক্তি দিতে হবে। না হলে তো সেটা না খেতে পেয়ে সেখানেই মরে পড়ে থাকবে! আমি কারোর প্রাণনাশের কারণ হতে চাই না। তাই ঘুমের ভান ধরে টেবিলের উপর মাথা রেখে স্থির হয়ে আছি। মেজর ঘুমিয়ে পড়লেই...
কিছুক্ষণ পর মেজর যখন সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়লেন তখন আমি এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার জীবনের সবচে' ভয়ঙ্কর এক সিদ্ধান্ত।  
 
 
 
----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 
 
 
 
হঠাৎ একটা ভীত পেঁচা ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেছে সেটা আমি খেয়াল করিনি। ঘুমন্ত মেজরের হাতের কাছ থেকে সন্তর্পণে চাবিটা তুলে এনে দরজা খুলে বেরিয়ে যেতে যেতে যখন ভাবছি যে, এই মাঝরাতে বেরোবার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমি এখন নতুন কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছি, ঠিক তখনই একটা টিকটিকি দূর থেকে টিক টিক টিক করে আওয়াজ দিয়েছে সেটাও আমি খেয়াল করিনি। এমনকি একজোড়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমাকে সারাক্ষণ দেখে দেখে রাখছে সেটাও আমার নজরে পড়েনি।
রাতের বেলা কাক ডাকতে শুনিনি কোনোদিন। আজ হঠাৎই একটা কাক উচ্চশব্দে ডেকে উঠল। সেই আওয়াজটা শুনে মনে হলো যেন, কাকটা খুব কষ্টে আছে। কিংবা কাউকে কষ্ট পেতে দেখেছে সে। তাই বিলাপ করছে। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়ে কোথাও কাকের দেখা মিলল না। ভেবেছিলাম মনের ভুল। ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে বলেই ভুলভাল জিনিস মাথায় আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখি দোতলার বেলকনি থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে একটা কাক। এমনভাবে পড়ছে যেন সেটাকে কেউ মেরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কৌতূহল মেটাতে দৌড়ে সেখানে গিয়ে দেখি সত্যি সত্যি একটা কাক মরে পড়ে আছে! না, তখনও মরেনি। মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমি দু'হাতে সেটাকে তুলে নিতেই আমার হাতের উপর কাকটা শেষবার "কা" উচ্চারণ করে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করল। কাকটার ডান পাখনার কিছু পালক ছেঁড়া এবং তার গায়ে ভারী আঁচড়ের দাগ। দেখেই মনে হচ্ছে ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর থাবা খেয়েছে কাকটা। হয়তো একটু লেগেছে। ভালো করে থাবা বসিয়ে দিতে পারলে কাকটাকে আর খুঁজেই পাওয়া যেত না।
মৃত কাকের দেহটা মাটিতে নামিয়ে রেখে মাথা উঁচু করে উপরের বেলকনির দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে, কাকটা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ডাকছিল। তখনই ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলোর একটি ছুটে এসে থাবা বসিয়ে দিয়েছে। যার ফলে কাকটা উপর থেকে নিচে পড়ে গেছে। কিন্তু উপরতলায় ওসব প্রাণী যাবে কীভাবে? গেটে, দরজায় এতগুলো তালা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এত বড়ো প্রাণী বাসায় ঢুকলে টের পাওয়া যাবে না? সবচে' বড়ো কথা হলো, সত্যি সত্যি প্রাণীগুলোর একটিও যদি ঘরে ঢুকত তাহলে মেজর সাহেব এতক্ষণে শ'খানেক গুলি ছুড়ে দিতেন।
কাকের মৃত্যুর ব্যাপারটা কাকতালীয় ভেবে মূল গেটের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু পেছন থেকে অর্থাৎ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দু'টো চোখ আমাকেই দেখছে সেটা আমি তখনও জানি না। আমি তখনও জানি না যে, এই বাড়িতে সত্যি সত্যি অদ্ভুত প্রাণী লুকিয়ে আছে। তা-ও একটা না, অনেকগুলো। সবগুলো চোখে হিংস্রতা, পেটে ক্ষুধা, আর মস্তিষ্কে রক্তের নেশা, মানুষ খুন করার নেশা।
অনেকটা দূর চলে আসার পর মনে পড়ল, আমি অস্ত্র না নিয়েই চলে এসেছি। রিভলবার তো দূর, আত্মরক্ষার জন্য এক টুকরো কাঠ পর্যন্ত নেই আমার কাছে। তবে বাঁ হাতে একটা কমলা আছে। খাবার টেবিল থেকে তুলে নিয়ে আসা কমলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সামনের দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম। মাঝে মাঝে মনে হলো যেন কে বা কারা আমার পিছু করছে। কিন্তু পেছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। পেছনে শূন্য ফাঁকা রাস্তা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। যদিও রাস্তাটা আর রাস্তা নেই। সেটা পতিত জমি হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন গাড়ি কিংবা মানুষ এদিকে না আসায় পিচঢালা রাস্তায় বড়ো বড়ো ঘাস উঠেছে। গাছের পাতা, ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। সাইকেল, রিকশা, মোটরবাইক সহ নানান জানবাহন পড়ে আছে এখানে সেখানে। ধুলো পড়তে পড়তে সেগুলো হনুমানের রূপ নিয়েছে। একসময় মানুষ নিজের সাইকেলটাও তালা দিয়ে রাখত যাতে চুরি না হয়। আর এখন ত্রিশ-চল্লিশ লাখ টাকার গাড়িটাও অযত্নে পড়ে আছে। দেখার কেউ নেই। নেওয়ার কেউ নেই। প্রাণ হাতে নিয়ে গাড়ি চুরি করতে আসে এমন সাধ্য কার?
পাবলিক টয়লেটের দরজাটা খুলে দিতেই বাচ্চা প্রাণীটা গোঁত গোঁত শব্দ করে আমার গা ঘেঁষে চারিদিকে চক্কর দিতে লাগল। তার গলার স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে, সে অভিমান করে আছে। যদিও অভিমান করাটাই স্বাভাবিক। আমি তাকে সেই দুপুর থেকে এখানে আটকে রেখেছি। বেচারা এতটা সময় ধরে দুর্গন্ধযু্ক্ত ময়লা টয়লেটে আটকা পড়ে আছে। এজন্য তার রাগ লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা অভিমান করা সত্ত্বেও আমাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে, থুঁতনি দিয়ে আলতো ধাক্কা দিচ্ছে দেখে আনন্দ লাগল এই ভেবে যে, মানুষ হোক বা অন্য কোনো প্রাণী, শিশু মানেই আদুরে। শিশুরা সাধারণত যার কাছে আদর পায় তার কাছেই সবসময় থাকতে চায়। তাকেই সব সময় ধরে রাখতে চায়। এই প্রাণীটার ক্ষেত্রেও তা-ই দেখছি। আমি একবার শুধু তার গায়ে হাত বুলিয়েছিলাম। এতেই সে আমাকে চিনে রেখেছে! সত্যিই ভারী অদ্ভুৎ সৃষ্টিকর্তার সকল সৃষ্টি।
প্রাণীটা আমার হাতের আধখাওয়া কমলা খাচ্ছে দেখে অবাক লাগল আমার। এরা তো মাংসাশী প্রাণী। তাহলে কমলার প্রতি এ'র এত আগ্রহ কেন?
আমার কৌতূহল আরো ঘনীভূত হয়ে এল, যখন দেখলাম প্রাণীটা কমলার ফেলে দেওয়া খোসাগুলোও হাতে নিয়ে খুব উপভোগ করে খাচ্ছে। এত বড়ো প্রাণী, এত বড়ো তার পেট। সারাদিন কিছু না খেয়ে এখন অর্ধেক কমলায় কিছু হয়নি। তাই খাওয়া শেষ করে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে প্রাণীটা। যাতে আমি আরো খাবার দেই। সব মিলিয়ে খুব বাজেভাবে সন্দেহ হতে লাগল আমার। মনে হলো যেন, কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। কোথাও কোনো একটা বিষয় লুকিয়ে আছে যা আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক আপাতত ধরতে পারছে না। তবে এই সবকিছুর আড়ালে বিশেষ এক রহস্যের গন্ধ পেতে শুরু করেছি আমি। প্রাণীটা নাছোরবান্দার মতো আমার পিঠে গাল ঘষছে। মানে তার আরো কমলা বা কমলার খোসা চাই। মাংসাশী প্রাণীর কমলার প্রতি এতটা আগ্রহ আমি কিছুতেই মানতে পারছি না। বিশেষ করে যেসব প্রাণী জীবিত মানুষকে চোখের পলকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। যেসব প্রাণীর ভয়ে পুরো শহর খালি হয়ে গেছে, সব মানুষ বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে সেই অতি ভয়ঙ্কর জাতের প্রাণীর আগ্রহ কিনা মামুলি কমলায়! যে একবার তাজা রক্ত আর কাচা মাংসের স্বাদ পেয়েছে তাকে কি এসব সামান্য জিনিস আকৃষ্ট করবে?
নাহ্! কোথাও একটা কিন্তু আছে। কিন্তুটা কোথাও তা আপাতত বের করতে পারছি না। এই মুহূর্তে প্রাণীটাকে বাগিয়ে দেখার জন্য দূরে ফেলে আসা এক টুকরো কমলার খোসা তুলে এনে সাথে একটি গাছের কচি পাতা এনে দিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রাণীটা সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে! কমলার খোসার সাথে গাছের পাতা! ওয়াক করে ফেলে দেওয়ার বদলে চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে খাচ্ছে!
শুকনো পাতার উপর দিয়ে একসঙ্গে অনেকে হেঁটে আসার শব্দ পেয়ে সতর্ক হয়ে গেলাম আমি। সামনে দৃষ্টি ফেলে দেখি অনেক দূরে অন্ধকার থেকে অনেকগুলো প্রাণী আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে। সবগুলোর দৃষ্টি আমার উপর। মৃত্যু নির্ঘাত জেনে নিজেকে প্রাণীগুলোর হাতে সমর্পণ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। আমি এত রাতে বেরিয়ে এসেছি। এটা জানতে পেরে ওরা ছুটে এসেছে। এতে আমার একটুও কৌতূহল নেই। কিন্তু যখন দেখি অদ্ভুত প্রাণীর দলের মাঝখান থেকে একটা মানুষ বেরিয়ে আসছে তখন কৌতূহলে আমার মুখ হা হয়ে এল। মানুষটা আগে আগে হাঁটছে। প্রাণীগুলো তাকে অনুসরণ করছে! আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সামনের মানুষটা আর কেউ না, স্বয়ং মেজর জোবায়েদ! 


----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------



একেবারে সাধারণ ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন মেজর জোবায়েদ। তাঁর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। ছোট্ট রিভলবার কিংবা উজি, সাবমেশিন কিছুই নেই। খালি হাতে এগিয়ে আসছেন তিনি। তাঁর পেছনে অসংখ্য মানুষখেকো প্রাণী। অথচ তাঁর চেহারায় বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ নেই!
খুব কাছাকাছি এসে তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাত দিয়ে ইশারা করতেই সবগুলো প্রাণী একসঙ্গে থেমে গেল। ওরা মেজরের কথা শুনছে! আশ্চর্য!
মেজরের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তিনি আমার উপর খুব বেশি বিরক্ত। গলা টান করে কড়া স্বরে তিনি বললেন, "ভেবেছিলাম তুই প্রমাণ-টমান জোগাড় করেছিস। এজন্য এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছি। প্রথম যেদিন তোকে দেখি, সেদিনই সন্দেহ হয়েছিল। সেদিন প্রথমবার কেউ নিয়ম ভেঙে এই শহরে উপস্থিতি দিয়েছিল। আর সেটা হচ্ছিস তুই। তোর আগে বহু মানুষকে জেল থেকে ছাড়া হয়েছিল শুধুমাত্র আমার এই প্রাণীগুলোর খোরাক হওয়ার জন্য। প্রতি রাতেই একটা করে মানুষ ছাড়া হত আর এরা মানুষটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত। কিন্তু তুই এসে সেই নিয়ম ভেঙে দিলি। তুই প্রথম মানুষ যে কিনা রাতের অন্ধকারে এই শহরের বুকে পা রেখে এখনও বেঁচে আছে। তাই তোর উপর আমার প্রাণীগুলো ভীষণ রেগে আছে। ভীষণ।"
বলতে বলতে তিনি হাত বাড়িয়ে দিতেই একটা প্রাণী মেজরের হাতের নিজে মাথা পেতে দিলো। মেজর প্রাণীটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, "আমার বাচ্চারা (প্রাণীরা) এখন তোকে ইচ্ছেমতো আঘাত করতে করতে মেরে ফেলবে। তোর রক্ত মাংসের স্বাদ নেবে।"
"তার মানে আপনিই এই প্রাণীগুলোর আবিষ্কারক?"
তিনি তাচ্ছিল্য করে বললেন, "না রে! আমি কেন ওসব করতে যাব? যা করার ওই পাগল বিজ্ঞানীটাই করেছিল। আমি তো শুধু এদেরকে ট্রেইন করেছি। এমন ট্রেইন করেছি যে ওরা নিজেদের মুনিবকেই খুন করে ফেলেছে, হা হা হা!"
"কেন এমন করলেন?" প্রশ্ন শুনে মেজর হাসি থামিয়ে বললেন, "কেন এমন করেছি? কারণটা বুঝতে পারছো না? এটাও বলে দিতে হবে?"
"আপনি এতটা জঘন্য লোক তা আমি ভাবতেও পারিনি।"
তিনি বিদ্রুপ করে হেসে বললেন, "রাজনৈতিক নেতারা যখন হাজারো মানুষকে মিথ্যে আশ্বাস দেয়, লোক ঠকায়, এমনকি মানুষ খুন করাতেও দ্বিধাবোধ করে না সেখানে আমি কেন পারব না? আফটারঅল সবার লক্ষ্য তো ওই এতটাই। পাওয়ার। এই পাওয়ারের জন্য সবাই কত কী করে। আমি নাহয় কিছু মানুষকে কোরবান করে দিলাম। আমি নাহয় কিছু স্বাভাবিক প্রাণীকে অস্বাভাবিক করে তুললাম। নাহয় দিলাম একটু আতঙ্ক ছড়িয়ে। এতে যদি সামান্য কিছুদিনের মধ্যে পুরো শহরটা দখল করে ফেলতে পারি তাতে ক্ষতি কী?"
"তার মানে এই প্রাণীগুলো মাংসাশী নয়। আপনি এদেরকে তাজা মাংস খাওয়া শিখিয়েছেন!"
"ভুল বললে। আমার পেছনে যাদেরকে দেখছো, তারা কেউই মাংস খায় না। তাদের প্রধান খাদ্য কলার খোসা, ঘাস, লতাপাতা, ফলমূল। এরা তো মানুষ খুন করে আমার জন্য। আমাকে খুশি করার জন্য। যাতে আমি পুরো শহরে রাজত্ব করতে পারি। দেখছো না কীভাবে অল্প সময়ে পুরো শহরটা খালি হয়ে গেছে? এখন এই পুরো শহর আমার। শহরের সবগুলো বাড়ি, সবগুলো গাড়ি, সব দোকানপাট, গাছপালা, রাস্তা, খোলা মাঠ, শহরের প্রতিটি ইট, প্রতিটি... সব আমার, সব। শীঘ্রই এমন একটা দিন আসবে যখন পুরো দেশটাই আমার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আমিই হব এদেশের একমাত্র নাগরিক।" বলতে বলতে মেজরের চোখদু'টো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"কিন্তু এটা কি ঠিক?"
"ঠিক বেঠিকের ধার আমি ধারি না। পাওয়ারের জন্য আমি সব করতে পারি। শীঘ্রই এই দেশটা ফাঁকা হয়ে যাবে। এদেশের সব মানুষ ভয়ে আতঙ্কে দেশ ছেড়ে পালাবে। আমার ভয়ে পালাবে। আমিই হব এখানকার একমাত্র জীবিত মানুষ!"
"তার আগে আমি আপনাকে খুন করে ফেলব।" ভীষণ রাগে কথাটা বলে ফেলার পর দেখি মেজর বিশাল প্রাণীটার মাথার উপর থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সাত ফুট উঁচু প্রাণীটা সোজা হয়ে দাঁড়াল। মেজর ধীর গলায় বললেন, "শেষ ইচ্ছে?"
"আপনার মতো অমানুষকে খুন করা।"
"হা হা হা! অল দ্য বেস্ট। কাম, কাম হিট মি। কিল মি। কিল মি বাডি। জাস্ট ডু ইট। হা হা হা হা হা!" অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন তিনি। বড়ো প্রাণীটাকে ইশারা করতেই সেটা আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। এমন সময় হঠাৎ মনে হলো চারপাশে ঝড় বইতে শুরু করছে। গাছপালাগুলো অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে। দূর থেকে কীরকম একটা শব্দ আসছে। লম্বা প্রাণীটা মাথা উঁচু করে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি প্রাণীরাও আকাশের দিকে তাকাল। মেজর জোবায়েদও চোখ তুললেন। আমিও। দেখি আকাশের কালো অন্ধকার থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে মস্ত একটা হেলিকপ্টার!
হেলিকপ্টার নিয়ে তিনজন এক্স মিলিটারি রওনা দিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে ভারী অস্ত্র। ভারী মানে খুবই ভারী। অদ্ভুত কিছু দেখলেই গুলি ছোঁড়া হবে।
এখন রাত হওয়ায় নিচের সবকিছু ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। তাই সামান্য উঁচু দিয়ে উড়ে চলেছে হেলিকপ্টারটা। একজন একটা ভারী অস্ত্র নিচের দিকে তাক করে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অপরজন বসে বসে চারদিকটা ভালো করে দেখে নিচ্ছেন। তার হাতে নাইট ভিশন বাইনোকুলার। তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ ক্যাপ্টেন মারুফ হেলিকপ্টার উড়াচ্ছেন। তিনি তাঁর দুই সহযোগী ক্যাপ্টেন আসিফ এবং ক্যাপ্টেন শাওনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমাদের কী মনে হয়? এই অন্ধকারে বিশেষ কোনো ক্লু পাওয়া যাবে?"
বাইনোকুলার দিয়ে যিনি দেখছিলেন, অর্থাৎ ক্যাপ্টেন আসিফ বিড়বিড়িয়ে জবাব দিলেন, "ক্লু'র জন্যই আমরা বেরিয়েছি। আমার মনে হয় এই সময়টাই ইনভেস্টিগেশন করার জন্য বেস্ট।"
তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ ক্যাপ্টেন শাওন তাঁর পুুরু ঠোঁটে ঢাউস সাইজের জ্বলন্ত সিগারেটটা রাখতে রাখতে বললেন, "ইনভেস্টিগেশন করার টাইম আছে নাকি? অস্বাভাবিক কিছু দেখলেই ধাম ধাম ধাম ফায়ারিং করব। ব্যাস, কিচ্ছা খতম।"
"কিন্তু নিচে জীবন্ত মানুষও থাকতে পারে। তোমার এই বেখেয়ালির জন্য একটা নির্দোশ মানুষের প্রাণ যেতে পারে সেটা কি তুমি জানো?" তীব্র বিরক্তি নিয়ে ক্যাপ্টেন শাওনের দিকে তাকালেন ক্যাপ্টেন আসিফ। শাওন সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, "অত ভাবার টাইম নেই। নিচে কিছু দেখলেই ফায়ারিং করব। ফাইন্যাল।"
"না, তুমি এটা কখনোই করবে না।" প্রতিবাদ করে বলে উঠলেন আসিফ। ক্যাপ্টেন মারুফ পেছনে তাকিয়ে বললেন, "তোমরা আবার শুরু করলে? এভাবে ঝগড়া করলে মিশন সাকসেসফুলি কমপ্লিট করা সম্ভব?"
"স্যরি।" আসিফ ও শাওন দু'জনেই চুপ মেরে গেলেন। আসিফ আবারো বাইনোকুলার দিকে চারপাশ দেখছেন। শাওন ভারী অস্ত্রটা একদিকে তার করে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু আগে ওয়ার্কআউট করায় তার হাতের বিশাল মাংসপেশি ফুলে শক্ত হয়ে আছে। হাতের শিরাগুলো চামরার উপরে উঠে এসেছে। কপালে ঘাম। গায়ের পাতলা টি-শার্ট ঘেমে জবজবা হয়ে আছে তাঁর। রাতের প্রায় একটা। তবুও এই তিনজনের কারোর চোখে ঘুম নেই। একটুও ক্লান্তি নেই। তিনজনেই সজাগ, সতর্ক। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে তাঁরা সদা প্রস্তুত।
হঠাৎ ক্যাপ্টেন আসিফ চিৎকার দিয়ে উঠলেন, "মাই গড!" তারপর বাইনোকুলার দিয়ে ভালো করে দেখতে লাগলেন। মারুফ বললেন, "কী হয়েছে?"
আসিফ বিস্মিত গলায় জানালেন, "ওই যে দু'টো জীবিত মানুষকে দেখা যাচ্ছে! একটা মানুষ একা দাঁড়িয়ে আছে। অপর পাশে দ্বিতীয় মানুষটা। তার পেছনে অদ্ভুত রকমের অসংখ্য প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণীগুলোর মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। যেন তাদেরকে কেউ একজন নিয়ন্ত্রণ করছে!"
হেলিকপ্টারটা যখন প্রাণীগুলোর মাথার উপর চলে এসেছে তখন সুযোগ পেয়ে ক্যাপ্টেন শাওন গুলি করতেই যাচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ক্যাপ্টেন আসিফ ঝাঁপিয়ে পড়ে বললেন, "ডোন্ট শুট। আই সেইড ডোন্ট শুট।"
ক্যাপ্টেন মারুফ বললেন, "গায়েজ, এটা আমি কী দেখছি?"
আসিফ এবং শাওন দু'জনেই কৌতূহলী হয়ে বললেন, "কী?"
মারুফ বললেন, "এদিকে এসো। হারি!"
ওঁরা দু'জনে এগিয়ে এসে দেখেন। তারপর দু'জনেই একসঙ্গে বলে উঠেন, "ও মাই গড!"
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 
 
 
তারপর তিনজন একসঙ্গে বলে উঠলেন, "ইটস্ ইমপসিবল!"
ক্যাপ্টেন মারুফ বিস্মিত গলায় বললেন, "সত্যিই ইনি মেজর জোবায়েদ তো? কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?"
তড়িৎ গতিতে পাল্টা প্রশ্ন করলেন ক্যাপ্টেন শাওন, "আমি নিজে দেখেছি সিক্রেট এজেন্সির শ্যুটার মেজরের বুকে পরপর দু'টো গুলি করেছে। লোকটা তখনই মারা গিয়েছিল৷ তাহলে দু'বছর পর সে আবার ফিরে আসল কীভাবে?"
ক্যাপ্টেন আসিফ বাইনোকুলারটা চোখ থেকে নামিয়ে বললেন, "আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর এটা মেজর জোবায়েদ।"
মারুফ বললেন, "তার মানে সে তার অতীতের বদলা নিচ্ছে?"
শাওন বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, "বদলা আবার কী? সে নিজের স্বার্থের জন্য ছয়টি তাজা আর্মিম্যানকে কোরবান করেছিল। সেটা সিক্রেট এজেন্সির হ্যাডের কানে যেতেই তিনি ব্যবস্থা নিলেন। মেজর যা করেছে এজন্য গুলি খাওয়া তার প্রাপ্প। সুতরাং এখন সে বদলা নিচ্ছে না বরং ক্রাইম করছে।"
আসিফ বললেন, "মেজর কি তাহলে এই প্রাণীগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে?"
"হুমম, তা-ই তো মনে হচ্ছে।" বললেন ক্যাপ্টেন মারুফ। তাঁদের মধ্যে সবচে' মাথা গরম যার, অর্থাৎ ক্যাপ্টেন শাওনের মেজাজ সব সময়ই একটু খারাপ থাকে। এখনও আছে। তিনি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বললেন, "এইবার শালাকে জীবনের শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।" বলেই তিনি ভারী অস্ত্রটা দু'হাত দিয়ে ঝাপটে ধরলেন। ক্যাপ্টেন মারুফ ও আসিফ দু'জনেই চেঁচিয়ে গুলি করতে নিষেধ করলেন কিন্তু ক্যাপ্টেন শাওন সেসব কানে না তুলে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে লাগলেন। গুলির শব্দে সবগুলো প্রাণী যে যেদিকে পারে ছুটে যেতে লাগল। তবে মেজর জোবায়েদ এক পা-ও নড়লেন না। যেখানে যেমন ছিলেন তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন।
গুলিবর্ষণ শেষ হতেই ব্যাকপ্যাকে রাখা ধারালো চাকুটা বের করে নিলেন ক্যাপ্টেন শাওন। বললেন, "শালার কপাল ভালো। একটা গুলিও লাগেনাই। তবে এবার সে আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।" বলেই প্যারাসুট নিয়ে লাফিয়ে পড়লেন তিনি। ক্যাপ্টেন মারুফ ও ক্যাপ্টেন আসিফ একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন কিন্তু ততক্ষণে ক্যাপ্টেন শাওন হেলিকপ্টার থেকে লাফিয়ে পড়েছেন।
শাওন যখন প্যারাসুট নিয়ে মাটিতে নেমে এসেছেন, তখন আশপাশে একটি পোকাও ছিল না। ধারালো নাইফ হাতে নিয়ে সন্তর্পণে এগোচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু অদ্ভুত প্রাণীগুলো যে গুলি শব্দে পালিয়ে গেলেও দূর থেকে মেজর জোবায়েদের ইশারার অপেক্ষা করছে সেটা ক্যাপ্টেন শাওনের ধারণার বাইরে ছিল। তাইতো তিনি যখন মেজরের থেকে মাত্র হাত দশেক দূরে, তখনই জমিন কাঁপিয়ে অসংখ্য প্রাণী ছুটে এল! একটা না, শত শত, হাজার হাজার প্রাণী! কিছু বুঝে উঠার আগেই ওরা ক্যাপ্টেন শাওনের দেহটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলল। তাই দেখে মেজর সরু হাসলেন। তারপর উপরের দিকে তাকিয়ে হেলিকপ্টারটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোদেরকেও দেখে নেব।"
গুলির শব্দে প্রাণীগুলো যখন দিশেহারা হয়ে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করেছিল, তখন সুযোগ পেয়ে আমিও পালিয়ে আসি। টানা কয়েক ঘন্টা হাঁটার পর একটা নদী কিংবা খালের সামনে এসে পৌঁছেছি। এপারে সব থমথমে হলেও, সব বাড়িগুলো পরিত্যক্ত হলেও ওপারের দৃশ্যটা অন্যরকম মনে হলো। তখন দূরে কোনো এক মানুষকে হেঁটে যেতে দেখে বুকে পানি এল। জীবিত মানুষ! তার মানে ওপার নিরাপদ!
সারা রাত হেঁটে আসায় ভীষণ ক্লান্ত লাগছে আমার। গত ক'দিন খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম হয়েছে। তার উপর আজব আতঙ্ক। গতকাল রাতে ধকল গেছে সবচে' বেশি। হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার পর প্রায় আধা ঘন্টা একটানা দৌড়েছি। এতেই আমার এনার্জি খতম হয়ে গেল। তারপর আবার সারা রাতের হাঁটাহাঁটি। এখন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও আমার নেই অথচ সামনের এই মস্ত খাল বা নদীটা সাঁতরে পার হতে হবে।
পানি ভেঙে যখন ভেজা শরীর নিয়ে কোনোমতে তীরে উঠেছি, তখন আর আমি আমার মাঝে নেই। মনে হলো, এখনি চোখ লেগে আসবে আমার। তারপর এখানেই মৃত্যু হবে। কিন্তু হঠাৎ মনে হলো, এদিকটায় আমি একজন মানুষকে দেখেছিলাম! জীবনটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাকে আরো একবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখাল। প্রাণটা যাই-যাই করছে। দেহটা তিরতির করে কাঁপছে। চোখদু'টোয় নেমে আসছে ঝাঁপসা কালো অন্ধকার। নামমাত্র শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলার পণ করেও এগোতে পারলাম না। ভোরের চকচকে সূর্যের আলো এসে পড়েছে নদী বা খালের গর্ভে। পেছন ফিরে তাকিয়ে সেই দৃশ্যটাই দেখলাম একবার। তারপর আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। ধপাস করে কাদাপানিতে দেহ অর্পণ করলাম।
তখনও আমার নিঃশ্বাস চলছে।
একটা লোক কোত্থেকে যেন ছুটে এসে আমার মুখের উপর ঝুঁকে পড়েছে। তার চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, "এই, কে আপনি? এই যে, শুনতে পারছেন? কোত্থেকে এসেছেন আপনি? এই!"
একটা ছায়ার মতো দৃশ্য দেখলাম এক পলক।
তারপরই আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হয়ে এল। মনে হলো আমি মারা গেছি। পরলোকে চলে আসার পর এখন বিশ্রাম করছি৷ কিন্তু আমার মাথার কাছে যে মেয়েটি বসে আছে সে কে? বেহেশতের হুর? রাশভারী চেহারায় সে আমার দিকে তাকাচ্ছে। তার চোখদু'টো কী গভীর! দৃষ্টিতে কী মমতা! ছোট্ট গোলাকার নথে এতটাই মানিয়েছে তাকে! মাথার চুলগুলোও প্রসংশা করার মতো। এলো চুলগুলো এক করে খোঁপা বেঁধে দিতে ইচ্ছে করল। পরে মনে হলো, এত চুল বুঝি খোঁপায় ধরবে না! খুব বেশি ফরসা নয়, দুধের মতো নয়, কেমন যেন তার গায়ের রং। বোঁচা নাকে এই প্রথমবার কাউকে এত সুন্দর দেখাচ্ছে। তা-ও এতটা! অবচেতনে গায়ের ওড়নাটা যে এলোমেলো হয়ে পড়েছে সেদিকে মেয়েটির খেয়াল নেই। থুতনিতে হাত দিয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে সে। তবে জ্ঞান নেই। অন্যমনস্ক মেয়েটি এখনও আন্দাজ করতে পারেনি যে আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি।
আজকের আগে আমি কারোর প্রতি মুগ্ধ হইনি, কখনো কাউকে দেখে এইটুকু আগ্রহ জাগেনি। এই প্রথমবার আমি কারোর চোখের প্রেমে পড়লাম। চোখের প্রেমে! সত্যিই তার দৃষ্টিতে কিছু একটা আছে। কিন্তু কী আছে? কে জানে!
"কে আপনি?"
প্রশ্ন শুনে হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পায় মেয়েটি। দূরে সরে গিয়ে বলে, "আপনার জ্ঞান ফিরেছে? আব্বুকে ডাকি।"
কিছুক্ষণ পর অনুমানে চল্লিশ কিংবা পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সি ভদ্রলোক ঘরে এলেন। তাঁর পিছু পিছু মেয়েটি। পুতুলের মতো মেয়ে। যে কেউ দেখলে ঘরে নিয়ে সাজিয়ে রাখতে চাইবে। আমারও সাধ জাগল। কিন্তু যার ঘর-ই নেই সে আবার পুতুল সাজাবে!
ভদ্রলোকের সাথে বিশেষ কথা হলো না। তিনি গম্ভীর মুখে জানালেন, রাত হয়ে গেছে। আমি নাকি প্রায় বারো ঘন্টা পর জেগেছি। আমার শরীর এখনও দুর্বল। তাই এখনই কিছু বললেন না। বিশ্রাম নিতে বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। রাতে ওই মেয়েটি সামান্য খাবার দিয়ে গেল। খেয়েদেয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। তখন রাতের কয়টা বাজে জানি না। কারোর চিৎকার শুনে সজাগ হয়ে যাই। চেয়ে দেখি সেই মেয়েটি এবং তার বাবা দু'জনেই এ-ঘরে চলে এসেছেন। আমাকে জেগে উঠতে দেখে বললেন, "জন্তুগুলো ওপারে ছিল। খাল পার হয়নি কোনোদিন। আজ মনে হয় খাল পেরিয়ে এপারে চলে এসেছে। যদি সত্যিই চলে আসে তাহলে কাউকে বাঁচতে দেবে না।"
ঢোক গিললেন তিনি। মেয়েটি বাবাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভীত মেয়েটিকে আরো সুন্দর লাগছে! তার বয়স কত হবে? ষোলো? সতেরো? এরকমই কিছু একটা হবে। সালোয়ার কামিজে এমনই মনে হচ্ছে। শাড়ি পরলে হয়তো আঠারো বছরের মনে হতে পারে।  
 
 
 
 ----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
 

 
সেই রাতে একই এলাকা থেকে তিনটি মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। এরপর মাত্র বারো ঘন্টার মধ্যে অধিকাংশ পরিবার প্রাণ হাতে নিয়ে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল। যারা রইল, তারাও শীঘ্রই চলে যাবে। আমি পুরোপুরি ঠিক হতে পারিনি বলে কোথাও যাইনি। আজ আবার কী হয় এই ভেবে আতঙ্কে ছিলাম। কিন্তু এতোটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবে তা আমার ভাবনার বাইরে ছিল।
তখন রাতের কয়টা তা ঠিক জানি না। ভরা আতঙ্কে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে আমার। অনেকটা সময় চোখ বন্ধ রেখেও ঘুম না আসায় একরকম বিরক্তি নিয়ে শুয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে একটু তন্দ্রার ভাব চলে এসেছিল। এমন সময় একটা ধারালো আওয়াজ আমার ঘোর কাটিয়ে দিলো। কেমন একটা গড়গড় আওয়াজ। এমন শব্দ আমি আগেও শুনেছি, যখন প্রথমবার অদ্ভুত প্রাণী আমার সামনে এসেছিল।
আওয়াজটা যখন আরো একটু তীব্র হলো, তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এটা ওই প্রাণীরই আওয়াজ! তার মানে ওরা এখানে চলে এসেছে! লাফ দিয়ে উঠে বসার আগেই দরজা ভাঙার শব্দ পাই। মুহূর্তের মধ্যে মৃদু আর্তনাদের শব্দ শোনা গেল। তারপরই মনে হলো যে, বিপদটা হাওয়ার বেগে ভাঙা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেছে!
দ্রুত ছুটে গিয়ে দেখি ভদ্রলোকের বিছানা ফাঁকা। মেঝেতে ফিনকি দিয়ে পড়া রক্ত! ফোঁটা ফোঁটা রক্ত দরজার দিকে চলে গেছে!
আমি দৌড়ে বাইরে যাই, ছুটে যাই সেই খাল বা নদীর সামনে। গিয়ে যা দেখি, তাতে আমার গায়ে কাঁপন ধরে যায়। অতি বিস্মিত গোল গোল চোখে দেখি, প্রায় ন' ফুট লম্বা একটা প্রাণী হাতের থাবায় একটা মানুষ নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নদী পার হয়ে যাচ্ছে! যন্তুটার হাতে সেই ভদ্রলোক, যিনি আমাকে তাঁর বাসায় আশ্রয় দিয়েছেন।
প্রাণীটা ও-পারে উঠে গিয়ে কেন জানি থেমে গেল। তারপর কী একটা মনে পড়তেই যেন পেছনে ফিরে আমার চোখ বরাবর তাকাল। দূর থেকেও প্রাণীটার চোখ-মুখ আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আজকের আগে এত ভয়ঙ্কর চেহারা আমি জীবনে দেখিনি! চোখে চোখ পড়তেই আমি দৃষ্টি নামিয়ে ফেলি। তখনই সেটা লাফিয়ে লাফিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়।
ভেবেছিলাম আজকের আতঙ্ক এখানেই শেষ। কিন্তু যাকে ধরে নিয়ে গেছে তাঁর মেয়ে, যে মেয়েটির বয়স এখনও আঠারো বছর হয়নি, সেই পুঁচকে মেয়েটাই আমাকে অবাক করে দিয়ে চোখের জল মুছে শক্ত গলায় বলল, "আব্বুকে ফিরিয়ে আনতে হবে।"
আমি হতভম্ব হয়ে বলি, "আজব প্রাণী ধরে নিয়ে গেছে। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত।"
"তবুও আমি যাব। আব্বু আমার একমাত্র আপনজন। তাঁকে আমার লাগবেই।"
"কিন্তু..."
মেয়েটি কথা শুনল না। ভাবলেশহীনভাবে সরু হাসি দিয়ে বলল, "আপনার ভয় লাগলে এখানেই থাকুন। আমি যাচ্ছি। আব্বুকে নিয়ে তবেই ফিরব।" বলেই হেঁটে হেঁটে জলে নেমে গেল মেয়েটি! মুহূর্তেই গভীর রাতের টলটলে জলের ভেতরে প্রবেশ করল সে। পায়ে হেঁটে বুক অবধি ডুবে গেল। একসময় গলা। তারপর তার পুরো দেহটাই জলের নিচে চলে গেল। অগত্যা পেছন থেকে বিক্ষিপ্ত আওয়াজ দেই, "দাঁড়ান! আমি আসছি।"
দ্রুত ছুটে নেমে যাই জলে। তারপর মেয়েটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাঁতরাতে থাকি। সামনে মৃত্যু অনিবার্য জেনেও আমরা এগিয়ে চলি। জানি, ওপারে হাজার হাজার প্রাণী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। একবার মানুষের অস্তিত্ব টের পেলেই...
ক্যাপ্টেন শাওনের আকস্মিক মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর দুই সহচর ক্যাপ্টেন আসিফ ও ক্যাপ্টেন মারুফ। দু'জনেই একগাদা মনিটরে কীসব দেখছিলেন। গত চব্বিশ ঘন্টায় তাঁরা দু'জনে মিলে কিছু ক্লু বের করেছেন। তাঁদের ধারণা, অবিশ্বাস্য হলেও খুব শীঘ্রই এই জটিল রহস্যের সমাধান করে ফেলবেন তাঁরা। যদিও রহস্য প্রায় খোলাসা হয়েই গেছে। সমস্যা অন্য জায়গায়। প্রভলেম সলভ্ করতে গিয়ে বেগ পেতে হবে তাঁদের। কারণ তাঁরা মাত্র দু'জন। আর প্রতিপক্ষ হাজার হাজার।
গত ক'দিন আগে তাঁরা তিনজন মিলে সিক্রেট অ্যাজেন্সির একটা মিশন কমপ্লিট করে দিয়েছিলেন। বিনিময়ে কিছুই নেননি। তবে আজ বিনিময় হিসেবে কিছু অ্যাডভান্সড্ টেকনোলজি আর বিশেষ কিছু অস্ত্র যা পৃথিবীতে খুব কমই আছে, সেইসব নিয়ে এসেছেন। প্ল্যান অনুযায়ী আজ রাতেই তারা ফাইন্যাল মিশনে নামার কথা। শেষ প্রস্তুতি চলছে। হঠাৎ অফিসার হাবিব এই বিশাল ঘরটায় পা রেখে বুক উঁচু করে স্যালুট দিয়ে বলল, "স্যার!" উই গট অ্যা ভেরি ব্যাড নিউজ।"
আসিফ এবং মারুফ একসঙ্গে অফিসার হাবিবের দিকে তাকালেন। আসিফ বললেন, "ব্যাড নিউজ? হুয়াট?"
"স্যার, ওই অদ্ভুত প্রাণীগুলো এতদিন একটি করে মানুষ চাইত। ডিমান্ড অনুযায়ী প্রতিদিন একটি মানুষ দিতে স্থানীয় সরকার বাধ্য। নাহলে ওরা শহরে তান্ডব চালাবে, নিরীহ মানুষ খুন করবে। তাই এতদিন জেলখানার আসামিদের মধ্যে থেকে প্রতিদিন একজন করে ওই প্রাণীদের কাছে পাঠানো হত। একটি মানুষ পেলে তারা আর কাউকে ডিস্টার্ব করত না। কিন্তু গতকাল রাতে ওই প্রাণীগুলো কী কারণে যেন পুরো জেলখানায় যতজন লোক ছিল সবাইকে খুব বাজেভাবে খুন করেছে। এমনকি শহরের বাইরে থেকেও লোকজনকে তুলে নিয়ে গেছে। আজ রাতে আবার কী হতে চলেছে বুঝতে পারছি না। সুতরাং আমার মনে হয় খুব দ্রুত কিছু একটা করতে হবে, স্যার। কারণ গতকাল থেকে ওই প্রাণীগুলো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। কেন এরকমটা হচ্ছে বুঝতে পারছি না স্যার।"
ক্যাপ্টেন আসিফ ও মারুফ দু'জনেই মুখচাওয়াচাওয়ি করলেন। তবে কিছু বললেন না। কারণ তারা জানেন, প্রাণীগুলো কেন এমন করছে। এই সবকিছু হচ্ছে ক্যাপ্টেন শাওনের জন্য। শাওন গতরাতে এলোপাথাড়ি গুলি করেছেন। কিছু গুলি হয়তো প্রাণীগুলোর গায়েও লেগেছে!
হঠাৎ কী মনে করে যেন ক্যাপ্টেন মারুফ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর অফিসার হাবিবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "উই গট অ্যা নিউ ব্যাড নিউজ।"
"হুয়াট, স্যার?" বলল অফিসার হাবিব।
মারুফ একটি মনিটরের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললেন, "সি।"
"এটা তো এই বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ স্যার। লাইভ চলছে।"
"তা তো আমিও জানি। তুমি এখানে দ্যাখো, লিফটের কাছে।"
অফিসার হাবিব মনিটরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে ফেটে পড়ল, "অদ্ভুত একটা প্রাণী এই বিল্ডিংয়ে চলে এসেছে, স্যার!"
"এক্সাক্টলি।"
কথা শুনে ক্যাপ্টেন আসিফও মনিটরে মনোযোগ দিলেন। হঠাৎ অন্য মনিটরে তাঁর চোখ পড়তেই তিনি বললেন, "একটা নয়, অনেকগুলো প্রাণী দেখা যাচ্ছে। এই দ্যাখো।"
আসিফের দেখানো মনিটরে চোখ রেখে আরো একবার আঁতকে উঠে হাবিব। ভরাট গলায় বলে, "স্যার, প্রাণীগুলো তো এদিকেই আসছে! লিফটে অনেকগুলোকে দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে আরো অসংখ্য প্রাণী ছুটে আসছে! এখন কী হবে স্যার?"

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.