মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : নয়/শেষ পর্ব)

 https://scontent.fdac90-1.fna.fbcdn.net/v/t1.6435-9/151496085_226397632527816_774635065230636308_n.jpg?_nc_cat=103&ccb=1-5&_nc_sid=8bfeb9&_nc_eui2=AeFiFWTo3daccuQc0BjRfu53658LgZqug3DrnwuBmq6DcDBHXrZPz8pkNmsGWnTMAKL1-RshHyJ6yH_zq7fBKdie&_nc_ohc=BnIBTxPdxPsAX_Tshfk&_nc_ht=scontent.fdac90-1.fna&oh=00_AT_MpA9I4nlLXTCQeQUKyyJzuyaqv6YxVB2VorCfSkYXiQ&oe=62780B09

 
গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : নয়/শেষ পর্ব)
 
মো. ইয়াছিন
 
 
দূর থেকে তাকিয়ে দেখছি আমার ডুপ্লিকেট-কে। দুঃখিত, সে আমার ডুপ্লিকেট নয়। আমিই তার ডুপ্লিকেট। দাঁড়োয়ানদের চোখে ধুলো দিয়ে সতর্ক পা পেলে এগিয়ে যাচ্ছে সে। আমিও এগিয়ে যেতে লাগলাম।
পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন, আমি তো টার্ডে ক্যাপসুল খেয়েই এখানে এসেছি। এখন আবার খাব কীভাবে? ব্যাপারটা খুব সহজ। আমরা শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি না। আমাদের ভাবনার জগৎ বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ তিনটি সময় নিয়ে হয়। সেই ভাবনায় অনেক কিছু থাকে। থাকে অতীতের কিছু স্মৃতি, ফেলে রাখা কিছু ভুল। যা আজীবন দাগ কেটে যায় মনের গহীনে। থাকে মিছেমিছি স্বপ্নের হাতছানি। যা আজও পূরণ হয়নি। থাকে বর্তমানের কিছু চাওয়া। থাকে ভবিষ্যতের রঙিন কিংবা সাদাটে ভাবনা। আর আমার আজকের এই ভাবনা অতীত নিয়ে। অতীকের ছোট্ট একটি ভুল, টার্ডে ক্যাপসুল খাওয়া নিয়ে। আজো আমি মনেপ্রাণে চেষ্টা করছি, টার্ডে ক্যাপসুলের চাবি খুঁজে বের করার। কিন্তু এখন আর চাবি খুঁজবার দরকার মনে করছি না। আমার অরিজিন্যাল তো সামনে দাঁড়িয়ে। এখন সে ভেতরে যাবে। পিসি সরিয়ে লকার বের করবে। কম্পিউটারে বাবার সেট করা অডিও, ভিডিয়ো রেকর্ড শুনবে, দেখবে। তারপর...
তারপর টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে মাইন্ড ট্রাভেলে আসবে। কিন্তু আমি তা কোনো মতেই হতে দেব না। আজ যদি ওঁকে টার্ডে ক্যাপসুল খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারি? হতে পারে আমি বেঁচে যাই! একবার ভেবেই দেখুন না। যদি আমার অরিজিন্যালকে টার্ডে ক্যাপসুল খেতে না দেই, তাহলে সে বেঁচে যাবে। আর সে বেঁচে যাওয়া মানেই তো আমার বেঁচে থাকা!
দাঁড়োয়ান দু'টো দেয়ালে টলে পড়েছে। দু'জনেই নাক ডাকছে। এই বুঝি ওঁদের ডিউটি! অনায়াসে ল্যাবের ভেতরে চলে এলাম। নিঃশব্দে এগিয়ে এসে যখন মূল ঘরে পা রাখলাম, আমার অরিজিন্যাল ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। এই যা! ক্যাপসুল খেয়ে ফেলল যে! তার হাত থেকে কাচের শিশি ফ্লোরে পড়তেই ভেঙে টুকরো টুকরো কাচের অংশ এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ল। কাচ ভাঙার শব্দে বাইরের ঘুমন্ত দাঁড়োয়ান দু'টো ছুটে এল। আমি অন্ধকারে দেয়ালের এক কোণে লুকিয়ে পড়লাম। দাঁড়োয়ানরা যখন আমার অরিজিন্যালকে ধরে তুলছিল, আমি চুপি চুপি বেরিয়ে এলাম।
এবার কী হবে!
অন্ধকার খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে চিৎকার দিলাম, 'চাবি মহাশয়, কোথায় আপনি?'
'এইতো এখানে!'
কথাটা শুনে থমকে দাঁড়ালাম। কী আশ্চর্য, চাবি কথা বলছে! পাশ ফিরে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম। এই বুঝি, দি আনএক্সপেকটেড! অচেনা মেয়েটি মৃত্যুর আগে তার নাম বলেছিল বারিশ। সেই মৃত বারিশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মেয়েটি আমার হাত চেপে ধরল। বলল, 'ভয় নেই। আমি ভুত নই। রিল্যাক্স। জাস্ট রিল্যাক্স।'
অ্যা! বললেই হলো? মৃত মানুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমি শান্ত থাকি কীভাবে!
'আপনি তো মারা গিয়েছিলেন। আবার ফিরে এলেন কীভাবে?' আমি ভয়ার্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল, 'মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি পেয়ে গেছি।'
'তাই নাকি! কীভাবে পেলেন? কোথায় সেই চাবি?'
মেয়েটি বোকার মতো হাসতে লাগল৷ হাসতে হাসতে বলল, 'এখনও বুঝতে পারেননি?'
'নাতো! কী বুঝবো?' আমি বললাম।
'মৃত্যুই মাইন্ড ট্রাভেলারের একমাত্র চাবি। আপনার বাবার ছুরিকাঘাতে নিহত হবার পরেই আমি পৃথিবীতে ফিরে গিয়েছিলাম। চোখ খুলতেই মাথায় এল, আরে! আমি বেঁচে ফিরলাম কীভাবে? আমাকে তো খুন করা হয়েছিল! তখনই বুঝলাম৷ মইন্ড ট্রাভেলে এসে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মরতে হবে। মৃত্যুই মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি।'
'কিন্তু এখানে ফিরে এলেন কীভাবে? আর কেনই বা এলেন?'
'বাঃ রে! এখানে এসে আপনাকে চাবির কথা না বললে আপনি ফিরে যেতে পারতেন পৃথিবীতে? আমি এসেছি আপনাকে বাঁচাতে। আপনাকে পৃথিবীতে ফিরতে সাহায্য করার জন্য।'
'কিন্তু কীভাবে এলেন?'
'যেভাবে প্রথমবার এসেছিলাম। টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে।'
'পৃথিবীর সর্বশেষ ক্যাপসুল তো আমি খেয়েছি। তাছাড়া বাবা এখন জেলে। আপনি দ্বিতীয় ক্যাপসুল কোথায় পেলেন?'
মেয়েটি খানিকটা গম্ভীর ভাব নিয়ে বলল, 'আপনার বাবার থেকে দু'টো ক্যাপসুল একসাথে কিনেছিলাম। পৃথিবীতে ফিরে গিয়েই দ্বিতীয় ক্যাপসুলটা খেয়ে ফেললাম।'
'যাক। ভালোই হয়েছে। দু'জনে একসাথে পৃথিবীতে ফিরব।'
মেয়েটির চোখ জুড়ে জল নেমে এল। চোখ-মুখ ফ্যাকাসে হয়ে এল। সে ভাঙা ভাঙা গলায় নিচু স্বরে বলল, 'বড় ক্লান্ত লাগছে। আপনার কাঁধে একটু মাথা রাখি?'
ততক্ষণে আমরা ঘাসের বুকে বসে পড়েছি। আমার সম্মতি পেয়ে আলতো করে মাথা রাখল। ভেজা চোখে আমার দিকে তাকাল। কাঁদোকাঁদো গলায় বলল, 'আমার আর পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া হবে না।'
আমি খানিকটা বিচলিত হলাম। মেয়েটির কথাটুকু বিষাক্ত কাঁটার মতো মনে হলো। অন্য সময় হলে হেসে উড়িয়ে দিতাম। কিন্তু না। এখন আমাকে বিশ্বাস করতেই হচ্ছে। মেয়েটি কাঁদছে। ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নীরব আর্তনাদ মিশে আছে তার কান্নায়। এই মুহূর্তে একটা প্রশ্নই বারবার মনে মনে আওড়াচ্ছি। কেন সে পৃথিবীতে ফিরে যাবে না?
'কেন যাবেন না পৃথিবীতে?' আমি জানতে চাইলাম।
মেয়েটি আমার থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে বসল। দু'হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, 'একজন মানুষ একবারই মাইন্ড ট্রাভেল করতে পারবে। দ্বিতীয়বার টার্ডে ক্যাপসুল খেলে মাইন্ড ট্রাভেলে আসতে পারবে ঠিকই। ফিরে যাওয়া আর হবে না। মস্তিষ্কেই মারা পড়বে।'
'আর যদি চব্বিশ দিন পূর্ণ হবার আগেই মস্তিষ্কে মৃত্যুবরণ করেন?' আমি বিস্ময়ের স্বরে বললাম।
'লাভ নেই। পৃথিবীতে ফিরে যাবার সব রাস্তা বন্ধ। আমার শরীরের মৃত্যু তখনই হয়েছে যখন আমি দ্বিতীয়বার টার্ডে ক্যাপসুল খেয়েছি। শুধু মস্তিষ্ক জীবিত রয়েছে। সেটাও চব্বিশ ঘন্টার জন্য। চব্বিশ ঘন্টা পর মস্তিষ্ক আর কাজ করবে না।'
'তাহলে কি আপনার পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই?'
'না, নেই।' বলে উদাসীন দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাল।
'তাহলে আমিও পৃথিবীতে ফিরে যাব না..' কথাটা বলে শেষ করার আগেই একটি ধারালো ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে লাগল। রক্তে আমার শার্ট ভিজে গেল মুহূর্তের মধ্যে। ঘাসের বুকে গা এলিয়ে দিলাম। তখনও আমি মস্তিষ্কে আছি। চেয়ে দেখছি, মেয়েটি আমার পাশে হাঁটু গেঁড়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদছে। আমি আর চোখ মেলে রাখতে পারছি না। ইচ্ছে করলেও কথা বলতে পারছি না। সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। তবুও হাত বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু স্বরে বললাম, 'হাতটা ধরুন। আসুন একসাথে বাঁচি।' সে আমার কথা শুনেছে কী না জানি না। তবে আমার হাত ধরেনি। হাউমাউ করে কেঁদেই চলেছে শুধু।
চোখ খুলতেই দেখলাম, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। উঠতে গিয়ে খানিকটা ব্যথা পেলাম, 'আঃ!' আবারো বিছানায় টলে পড়লাম। হাতে হ্যান্ডকাপ লাগানো। মাথায় ব্যান্ডেজ। বাঁ হাতের কনুইয়ে ব্যান্ডেজ। টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে ফ্লোরে পড়ে এই অবস্থা হয়েছে কি?
চোখ খুলেছি দেখেই নার্স ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকাল। তারপর দ্রুত ছুটে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার ছুটে এলেন। আমার হার্টবিট চেক করলেন। চোখ দেখলেন। তারপর...
ছয় মাস পর।
দীর্ঘ ছ'মাস পর জেল থেকে বেরোলাম। জেলখানার বাইরে পা রেখে প্রথমেই স্থির করলাম, বারিশের সাথে দেখা করব। জেলে থাকাকালীন উকিলকে দিয়ে বারিশের ঠিকানা জোগাড় করে রেখেছি। উকিল ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করেছে, 'মেয়েটি আপনার কী হয়?'
আমি সোজা জবাব দিয়েছি, 'আমার এক প্রিয়জন।'
উকিল মুখ ভার করে বলেছে, 'সো স্যাড!'
রিকশা থেকে নেমে দু'মিনিটের পথ। ঠিক এখানটায় শুয়ে আছে বারিশ। পাশেই তার মা বাবার কবর। কবরে লাগানো পিতলের সাইনে লেখা বারিশ নামটা জ্বলজ্বল করছে।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কখন সন্ধ্যা নেমেছে খেয়াল করিনি। ভাঁজ করা শার্টের হাতলে চোখের জল মুছছিলাম। 'দাড়িতে আপনাকে বেশ মানায় তো!' কথাটা শুনে ফিরে তাকালাম। বিস্ময়ের স্বরে বললাম, 'আপনি!'
বারিশ গম্ভীরমুখে বলল, 'গোঁফ রেখেছেন কেন? গোঁফ কেটে ফেলবেন।'
'আবার ফিরে এলেন কীভাবে?' আমি বললাম।
'এমন কোনো যন্ত্র কি নেই, যার সাহায্যে আমি আবার জীবিত হয়ে যেতে পারি?' প্রশ্ন এড়িয়ে জিজ্ঞেস করল। আমি বিস্মিত হয়ে তাকিয়েই রইলাম তার দিকে। সে আবারো বলল, 'কী, পারবেন না এমন একটা যন্ত্রের সন্ধান করতে?'
'সেটা কীভাবে সম্ভব?' আমি বললাম।
'আপনি চাইলে সব সম্ভব।' বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে।
'একা একা কী বিড়বিড় করছেন?' কথাটা শুনে স্তম্ভিত ফিরে পেলাম। তাকিয়ে দেখি, খানিকটা দূরে এডভোকেট করিমুজ্জামান দাঁড়িয়ে আছেন। আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, 'উকিল সাহেব, আপনি!'
'এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। অন্ধকারে আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলাম। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?'
'করুন।'
'এই কবর কি আপনার প্রেমিকার?'
আমি চুপ করে রইলাম। এডভোকেট করিমুজ্জামান বললেন, 'বলতে না চাইলে থাক। আচ্ছা, আপনার বাবা তো বহুদিন ধরে জেলে আছেন। তাকে বের করার জন্য কিছু করতে হবে কি?'
'সে আমার মায়ের খুনি। খুন করেছে এবার শাস্তি পাক।'
'বলেন কী! তাহলে তো আপনার বাবার বিরুদ্ধে মার্ডার মামলা ঠুকে দেওয়া দরকার।'
'তার আর দরকার নেই। তিনি আগামীকাল মারা যাবেন।'
'আপনার বাবা আগামীকাল মারা যাবেন সেটা আজ জানলেন কীভাবে?' উকিল সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন।
'ডেথ ডে কাউন্টার।'
'সেটা কী জিনিস?'
'একটি মেশিন। মানুষের ছবি দেখে তার মৃত্যুর খবর আগে থেকে জানিয়ে দেয়।'
 
 
 
 
(সমাপ্ত)

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.