
গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : ছয়)
মো. ইয়াছিন
প্রতিদিনের মতো সকাল হয়েছে ঠিকই, তবে স্বাভাবিক কোনো সকাল না। সম্পুর্ণ অপ্রত্যাশিত ভয়ঙ্কর এক সকাল। এই একটা সকাল নতুন করে ভয় দেখাল আমায়।
বিছানায় গা ছড়িয়ে শুয়া অবস্থায় অল্প একটু চোখ মেলতেই ঝলমলে আলো দেখে আৎকে উঠলাম। দ্রুত চোখ বন্ধ করে আবার যখন তাকালাম, অতিরিক্ত কোনো আলো নেই। চারপাশ স্বাভাবিক। তবে আমি স্বাভাবিক নই। নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। কেউ একজন আমার বুকের উপর বসে গলা চেপে ধরেছে। আমি ইচ্ছে করলেও হাত-পা নাড়াতে পারছি না। চিৎকার দিতে পারছি না। এদিকে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। চোখদু'টো খুলে বেরিয়ে আসার উপক্রম। বুকের ভেতর ফেটে যাচ্ছে। এক্ষুণি নিঃশ্বাস না নিলে...
ছাড়া পেয়ে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিতে নিতে ফিরে তাকালাম। ততক্ষণে তিনি আমার বুকের উপর থেকে উঠে কিছুটা দূরে গিয়ে বসেছেন। সেই ভদ্রমহিলা। যিনি নিজেকে আমার মা বলে দাবী করেছিলেন। কিন্তু তিনি আমার গলা চেপে ধরবেন কেন?
'ভয় লাগছে?'
আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, 'আপনি আমার গলা চেপে ধরেছিলেন কেন?'
তিনি নিতান্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, 'কেন আবার! মেরে ফেলার জন্য। কিন্তু তুমি জেগে গেলে। আরো কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতে পারলে না? একটুর জন্য তোমাকে...'
'আপনি আমাকে মেরে ফেলতে চাইছেন কেন?'
'তোমার মা'কে ভালোবাসো না?' আমার একদম কাছে বসে ফিসফিস করে বললেন।
'বাসি। খুব ভালোবাসি।'
'এজন্যই মেরে ফেলতে চেয়েছি। তোমার মা পৃথিবীতে নেই। তুমি একা একা বেঁচে থেকে কী হবে, বলো?'
'তাই বলে... আমি মা'কে ভালোবাসি ঠিকই। কিন্তু আমার নিজের থেকে বেশি না। আমি মরতে চাই না।' চিৎকার করে বললাম।
ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়ে হুঁ হুঁ করে হেসে উঠলেন, 'বাঁচতে চাও? কিন্তু বাঁচতে তো পারবে না। আমি না মারলেও তুমি মরবে। বারো দিন কেটে গেছে। তোমার অর্ধেক আয়ু শেষ। চেয়ে দেখ, ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছো। আর ক'টা দিন। আর ক'টা দিন মাত্র...' বলতে বলতে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
'কিন্তু, আমি তো বাঁচতে চাই। বাঁচতে চাই আমি। ফিরে যেতে চাই সুন্দর পৃথিবীতে।'
বিছানা থেকে নেমে বুঝলাম, আগের মতো হাঁটতে পারছি না। শরীরটা কেমন যেন দূর্বল লাগছে। চোখেও একটু একটু ঝাপসা দেখছি। কোমড় ব্যথায় টনটন করছে। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মাথার পেকে যাওয়া চুলগুলো চোখে ভাসল। এক দিনে এত পরিবর্তন! মনে হচ্ছে বয়স অনেকটা বেড়ে গেছে। গত ক'দিন শেভ না করায় দাড়ি-গোঁফ গজিয়েছে মুখে। সেগুলোও পাকতে শুরু করেছে। দেখে মনে হচ্ছে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়েসী একজন দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমি, আমি তো...
হঠাৎ আয়নায় বাংলা অক্ষরে লেখা ভাসতে লাগল। একের পর এক। একের পর এক। এটা আয়না না কি মনিটর? হাত দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলাম। নাঃ, আয়নাই তো! তাহলে? লেখাগুলো এরকম, জীবন মানেই যুদ্ধ। আর মরতে মরতে বেঁচে থাকার নামই জীবন।
চলার পথে বাধা আসবেই। থেমে যাওয়া মানে হেরে যাওয়া।
একটি একটি মুহূর্ত মূল্যবান। গত এক সেকেন্ড আর ফিরে পাবে না।
বিজয় উল্লাসে সবাই অংশ নেয়। লড়াই করতে হয় একা একা।
মেসেজগুলো কি আমার মস্তিষ্ক পাঠাচ্ছে? এগুলোর মানে কী? আমাকে কোথাও যেতে বলছে কি?
আয়নায় লেখা, এখনও দাঁড়িয়ে আছো!
দ্রুত বেগে ছুটছি তো ছুটছি। বিন্দু বিন্দু ঘাম কপাল বেয়ে মাটিতে পড়ছে। উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে ছুঁটতে ছুঁটতে একসময় যখন হাঁটুতে ভর করে কোনোমতে দাঁড়ালাম, মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখি, হাত দশেক দূরে সম্পুর্ণ অন্য এক জগত। এতটা কাছ থেকে সবকিছু আবছা দেখাচ্ছে। যতটা আন্দাজ করতে পারছি, ওপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বড় বড় মেশিন। এরকম মেশিন আগে কখনো দেখিনি। তার উপর এত বড় বড়। মনে হচ্ছে মেশিন রাখা হয়েছে মাটিতে অথচ এর উচ্চতা আকাশ পর্যন্ত। মাখাটা আরো একটু উঁচু করে দেখি, আকামে জমে থাকা এক টুকরো কালো মেঘ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেশিন।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু এ কী! যতটা দ্রুত এগিয়ে যেতে চাচ্ছি, ঠিক ততটাই জোরে বাতাসের মতো কিছু একটা আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার। আবার। আবার। ক্লান্ত হয়ে যখন হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসলাম, সেই মেয়েটি ধীর পায়ে মেশিনের জগৎ থেকে বেরিয়ে এল। ধীর পায়ে এসে আমার পাশাপাশি বসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি ওখানে গেলেন কীভাবে?'
'আপনি যেতে পারবেন না বলে আমিও পারব না নাকি!' ভ্রু কুঁচকে আলতো হেসে বলল।
'কথা পেঁচাচ্ছেন কেন? যা জিজ্ঞেস করেছি, সোজা উত্তর দিন।'
'আপনার প্রশ্নটা যেন কী?'
'আপনি ওখানে গেলেন কীভাবে?'
'কীভাবে আবার। পায়ে হেঁটে।'
'আমি যেতে পারছি না কেন?'
'ওহে মিস্টার, ওদিকে আপনি কখনোই যেতে পারবেন না। ওটা আপনার মস্তিষ্কের বাইরে। আমরা যে নিজেদের মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছি সেটা ভুলে গেছেন?'
চিন্তায় পড়ে গেলাম। সত্যিই তো! আমরা তো নিজেদের মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর বাইরে পা রাখতে হলে মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি লাগবে। যা আমার কাছে নেই।
'ওদিকটায় কী করছিলেন?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।
'চাবি খুঁজছিলাম। যখন দেখলাম আপনি ওখানে যেতে পারছেন না, তখন বুঝতে পারলাম...' বলে চুপ করে গেল।
'কী বুঝলেন?'
'বুঝলাম ওখানে চাবি নেই।'
'কেন, চাবি নেই কেন?'
'চাবি থাকলে ওখানে আপনি যেতে পারতেন। চাবি এমন জায়গায় আছে, যেখানে টার্ডে ক্যাপসুল খাওয়া সকল ব্যক্তি যেতে পারবে। আপনি যেহেতু যেতে পারছেন না...'
সত্যিই তো! আমার মাথায় ব্যাপারটা এল না কেন?
একসাথে পাশাপাশি অনেকটা পথ হেঁটেছি। এখনও হাঁটছি। একবার চোখ তুলে মেয়েটির দিকে তাকালাম। কী সুন্দর মেয়েটা! ধবধবে সাদা না। কালো না। শ্যামলাও বলা যায় না। তবে চুল ব্রাউন কালার করা। মেয়েটিকে দেখতে ঠিক সেরকমই লাগছে, যেরকম প্রথম দিন দেখেছিলাম। কোনোরূপ পরিবর্তন হয়নি। চুল পাকেনি। গায়ের চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি। এমনকি হাঁটাচলা কিংবা কণ্ঠেও কোনো রকম পরিবর্তন দেখছি না। তাহলে কি মেয়েটির আয়ু কমছে না? সে কি চাবি ছাড়াও বেঁচে থাকতে পারবে?
'কী দেখছেন এমন করে?' আমার চোখে চোখ রেখে কথাটা বলেই চোখ ফিরিয়ে নিল।
'দেখছি না। ভাবছি।'
'কী ভাবছেন?'
'আর মাত্র কয়েকটা দিন হাতে আছে। চাবি খুঁজে পাইনি। ফিরে যাবার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। অথচ ধীরে ধীরে আমার আয়ু কমে যাচ্ছে। শরীরটা কেমন যেন দূর্বল হয়ে গেছে। চুল-দাড়ি সব পেকে যাচ্ছে...'
কথা শেষ হবার আগেই মেয়েটি ধমকের স্বরে বলল, 'চুপ, একদম চুপ। এমন কিছুই হবে না। আমরা পৃথিবীতে ফিরব। ওখানে আমাদের দেখা হবে। কথা হবে। পৃথিবীর মুক্ত বাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেব দু'জন।'
আমি বললাম, 'সত্যিই ফিরতে পারব তো?'
(চলবে)
[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]
বি. দ্র. এই পর্বে যেসব উক্তি দেওয়া আছে সবগুলো আমার। কারোর থেকে কপি করিনি। ভুলক্রমে কারোর সাথে মিলে গেলে বলবেন। আমি শুধরে নেব।