
গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : পাঁচ)
মো. ইয়াছিন
বাবার ক্লায়েন্ট অর্থাৎ সেই সাইকো কিলারের সামনে বসে আছি। এরকম একজন ভয়ঙ্কর আসামীর সাথে এত সহজে দেখা করতে পারব, ভাবিনি। নিজের মস্তিষ্কে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তাই হয়তো সম্ভব হয়েছে।
মাইন্ড ট্রাভেল করছি, আজ দশ দিন৷ হাতে খুব বেশি সময় নেই। চৌদ্দ দিনের মধ্যে ফিরে যেতে হবে। তাই ভাবলাম, ফিরে যাবার আগে সাইকো কিলারের ব্যাপারটা একটু দেখে নেওয়া যাক। বলা তো যায় না, কার কাছে আছে সেই বিস্ময়কর চাবি। যার দ্বারা পৃথিবীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব।
বাবাকে রাজি করাতে অনেকটা বেগ পেতে হয়েছে। কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না তিনি। আমার আকুতি-মিনতি দেখে অবশেষে রাজি হলেন। কিলারটাও বাবার কথায় রাজি হয়ে গেল। তবে একটা শর্ত দিয়ে বসল। শর্তটা হলো, সে একটা যন্ত্র দেবে। সেই যন্ত্র আমার মাথায় বসাতে হবে। তবেই সে আমাকে পনেরো মিনিট সময় দেবে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম।
আমি শ্রেফ ওই খুনির সাথে দেখা করতে চেয়েছিলাম। এর বেশি কিছু না। দেখা করার জন্য পনেরো মিনিটই যথেষ্ট। সময় দেওয়া হয়েছে দুপুর দুইটায়। সেই একটা পঁচিশ মিনিট থেকে বসে আছি। ধীরে ধীরে যখন একটা পঞ্চাশ বাজল, তারপর একানো, বাহান্নো, তেপ্পান্ন আমি ভাবলাম, লোকটা বোধহয় আর আসবে না। আসলেও লেট করে আসবে। কিন্তু না। লোকটা ঠিক সময়মতো এল৷ দেয়ালে ঝুলে থাকা গোলাকার ঘড়িতে দুইটা বাজতেই লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে এল। ঘরে প্রবেশ করেই দরজা বন্ধ করে দিলো।
কোর্ট রুম। শনিবার হওয়ায় সরকারি ছুটি। ছুটির দিনে ফাঁকা কোর্ট রুমে বসে আছি। এতক্ষণ মনে মনে কত কী প্রশ্ন মুখস্ত করেছিলাম, লোকটাকে জিজ্ঞেস করব বলে। কিন্তু এখন সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে টু শব্দ অবধি বেরোচ্ছে না। একটু একটু ভয় লাগছে। লোকটা সবার মতো আমাকেও যদি খুন করে ফেলে?
ঘড়িতে দুইটা বেজে পাঁচ মিনিট। এই পাঁচটা মিনিট চুপ করে বসে থেকে কাটিয়ে দিয়েছি। লোকটাও চুপ করে বসে আছে। কোনো কিছু বলছে না। কিছুক্ষণ পর পর দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে শুধু।
ধীরে ধীরে দুইটা দশ বেজে গেছে। লোকটা এখনও আগের মতোই চুপচাপ বসে আছে। মাঝে মাঝে দেয়াল ঘড়ির দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। এত শান্ত একটা লোক কীভাবে মানুষ খুন করতে পারে?
'আমি খুনি নই।' লোকটা মাথা তুলে তাকাল আমার দিকে। আরো একবার বলল, 'আমি খুনি নই।'
অ্যা! এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর হঠাৎ এমন একটা কথা বলার ছিল? এতগুলো খুন করে বলছে আমি খুনি নই! তাহলে কি খুনগুলো আমি করেছি?
'না, তুমিও করোনি। আমরা কেউ খুন করিনি।'
আশ্চর্য! আমি মনে মনে যা ভাবছি, লোকটা জেনে যাচ্ছে কীভাবে!
'তোমার মাথায় হেডফোনের মতো যে যন্ত্রটা লাগিয়েছো, সেটা মাইন্ড রিডার। মানুষের মন পড়া এই যন্ত্রের কাজ। এর সাহায্যে তুমি যা ভাবছো সবকিছু আমি জেনে যাচ্ছি। তুমি মুখে না বললেও আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।'
আমি মনে মনে ভাবলাম, 'ও বাবা! এরকম একটা যন্ত্র লোকটা পেল কোথায়?'
কিলার সহজ গলায় বলল, 'ঠিকই ভাবছো। এরকম যন্ত্র পৃথিবীতে একটাই আছে। যা এখন তোমার মাথায়।'
'তাহলে টেকনোলজির বদৌলতে জেলে বসে বসে খুন করতে পারছেন।' আমি বললাম।
লোকটা মাথা নিচু করে কুৎসিত ভঙ্গিতে বলল, 'না, আমি খুন করিনি। আমার কারণে খুন হয়েছে ঠিকই। তবে আমি নির্দোষ। কেউ আমাকে বুঝল না। কেউ না।'
'এটা কীভাবে সম্ভব? আপনি কি বলছেন, আর কেউ খুন করে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে?'
লোকটা আমার কথার জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। আমার মাথা থেকে মাইন্ড রিডার খুলে নিয়ে ধীর পায়ে চলতে শুরু করল। আমি পিছু ডাকলাম, 'কোথায় যাচ্ছেন? জবাব দিয়ে যান। কী হচ্ছে আপনার সাথে?' লোকটা আমার কথা না শোনার ভান করে দরজা খুলে বেরোতে যাচ্ছিল। আমি যখন বললাম, 'মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি কি আপনার কাছে আছে?'
লোকটা দুম করে দরজা বন্ধ করে দ্রুত ফিরে আসতে লাগল। ফুঁসতে ফুঁসতে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কলার চেপে ধরল। আমি ভাবলাম, আমাকেও বুঝি খুন করে ফেলবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কী যেন মনে করে শান্ত হয়ে গেল লোকটা। কলার ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল। আমি ছুটলাম তার পিছু পিছু, 'দাঁড়ান। বলে যান। মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি আপনার কাছে আছে কি?'
বলতে বলতে যখন দরজার সামনে এলাম, বাবা পথ আটকে দাঁড়ালেন। বললেন, 'তোমার সময় শেষ।'
ঘড়ির দিকে তাকালাম। দুইটা ষোলো মিনিট।
একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে উঠে বসতেই দেখি, আমার বাঁ পাশে বাবা শুয়ে আছেন। বাবা এ ঘরে! তাহলে বাবার ঘরে কে? সতর্ক পা ফেলে উঠে দাঁড়ালাম। মোমবাতি জ্বালিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। নিভু নিভু আলোয় যতটুকু দেখা যাচ্ছে, বাবার বিছানার উপর মশারি টানানো। ভিতরে একটা বালিশ পাতা। বিছানার ঠিক শেষের দিকে কাঁথা ভাঁজ করে রাখা। তাহলে এখানে কে শুয়েছিল? আর কে থাকে এ বাড়িতে?
নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। এক পশলা বাতাস এসে আমার হাতের মোমবাতি নিভিয়ে দিলো। আকাশের অর্ধচন্দ্রের আলোয় চারপাশ আবছা আন্দাজ করা যাচ্ছে। আমি নিভে যাওয়া মোমবাতি হাতে নিয়ে আরো একটু এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমার পাশাপাশি কেউ একজন হাঁটছে।
'এত রাতে একা একা কী করছেন?' অচেনা মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
আমি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললাম, 'আপনি কী করছেন?'
'বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না।' মেয়েটি একটু দূরে সরে গেল।
'বিশ্বাস না করার কী আছে! আপনি বলুন।'
'একটা চাবি খুঁজছি।' বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আমার দিকে ফিরে বলল, 'আমি আপাতত আমার মস্তিষ্কে ট্রাভেল করছি। আপনি, এই অন্ধকার রাত, আকাশের চাঁদ কিছুই সত্য নয়। সব ঘটছে আমার মস্তিষ্কে। তবে আমাকে খুব শীঘ্রই বাস্তবে ফিরতে হবে। ফিরতে হলে একটা চাবির প্রয়োজন। যা এখন আমার কাছে নেই। আপনি কি আমাকে সেই চাবি খুঁজে পেতে সাহায্য করবেন?'
মেয়েটির কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কে কার মস্তিষ্কে আছে তাহলে? আমি তার মস্তিষ্কে না কি সে আমার মস্তিষ্কে?
'আমিও আপনার মতো মাইন্ড ট্রাভেল করছি। এবং এই পদ্ধতির আবিষ্কারক আমার বাবা।' আমি বললাম।
মেয়েটি আরো দূরে সরে গেল। উদাসীন ভাবে আমার দিকে তাকাল, 'জানতাম আপনি বিশ্বাস করবেন না।' বলে চলে যেতে লাগল।
আমি জোরে বললাম, 'টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে এখানে এসেছেন। চব্বিশ দিনের মধ্যে আপনাকে ফিরতে হবে...'
মেয়েটি ধীর পায়ে ফিরে এল। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, 'এসব আপনি জানলেন কীভাবে?'
(চলবে)
[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]