মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : চার)

 https://scontent.fdac90-1.fna.fbcdn.net/v/t1.6435-9/151496085_226397632527816_774635065230636308_n.jpg?_nc_cat=103&ccb=1-5&_nc_sid=8bfeb9&_nc_eui2=AeFiFWTo3daccuQc0BjRfu53658LgZqug3DrnwuBmq6DcDBHXrZPz8pkNmsGWnTMAKL1-RshHyJ6yH_zq7fBKdie&_nc_ohc=BnIBTxPdxPsAX_Tshfk&_nc_ht=scontent.fdac90-1.fna&oh=00_AT_MpA9I4nlLXTCQeQUKyyJzuyaqv6YxVB2VorCfSkYXiQ&oe=62780B09

 

গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : চার)
 
মো. ইয়াছিন
 
 
সাতটা দিন কেটে গেছে। চাবি তো দূর, চাবির ছায়া পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। এদিকে বাবার সাইকো ক্লায়েন্ট জেলে বসে বসে একের পর এক খুন করে চলেছে। অচেনা সেই মেয়েটিকেও আর দেখা যাচ্ছে না।
উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় একটা শুকনো জাম গাছের নিচে বসেছিলাম সেই বিকেলে। সূর্য যখন ডুবি ডুবি করছিল, একটা রাখাল গরু চড়াতে এসে আমাকে বসে থাকতে দেখে বলল, 'ভাইজান এইখানে কী করতাছেন? একটু পরেই তো অন্ধকার নামব। জায়গাটা দোষী। এই যে জামগাছটা দেখতাছেন, এইটাও দোষী। রাইতে এইখানে জিনেরা আসে। মানুষ দেখলেই শেষ।' আমি তার কথায় কান দিলাম না। আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে রাখাল ছেলেটা যেতে যেতে বলল, 'এখনও বইসা আছেন? জানের মায়া নাই নাকি?'
তখনও আবছা আলো ছিল। এখন ঘন অন্ধকার। দূর দূর পর্যন্ত আলো নেই। এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে নির্জন পাহাড়ে বসে থাকলে যে কারোর ভয় লাগত। আমিও হয়তো ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। কিন্তু এখন ভয় নেই। যে কিছুদিন পর মরতে চলেছে তার আবার কীসের ভয়? পৃথিবীতে ফিরে যাবার চাবিটা আর পাব না। বেঁচে থাকা আর হবে না। এই যা! চাবির কথা ভাবতেই মনে পড়ল, বাবা একটা চাবি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, চাবিটা যেন শাহীন আঙ্কেলের বাসায় দিয়ে আসি। অথচ আমি এখানে বসে আছি!
যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি তার থেকে প্রায় একশো হাত দূরে পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট দোচালা ঘর। সেখানে থাকেন শাহীন আঙ্কেল। তিনি আমাদের বাসায় কাজ করেন। রান্না করা, কাপড় ধুয়ে দেওয়া, ঘর পরিষ্কার করা সহ সবকিছু তিনিই করেন।
হাঁটতে শুরু করেছি মাত্র, পিছন থেকে আওয়াজ এল, 'এই যে শুনুন..'
আমি বিন্দুমাত্র অবাক হলাম না। মনে হচ্ছে, এরকম কিছু ঘটতে চলেছে, তা আমি আগে থেকেই জানি। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, সেই অচেনা মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে টর্চ। বলল, 'আপনার বাবা কি খুনিদের বাঁচানোর জন্যই ল' পড়েছেন?'
এবার আমি একটু অবাক হলাম। এইটুকুনি একটা মেয়ে। কত ভালো লাগে দেখতে। কী মায়া ভরা চেহারা। অথচ, খুন-খারাবি ব্যতীত কোনো কথাই বলে না। আর ওঁর চোখ? ওই চোখদু'টো এমন কেন? দেখলেই মনে হয় কী যেন খুঁজে চলেছে। কী খুঁজছে ওই চঞ্চল চোখদু'টো?
মেয়েটি এবার বিরক্তির স্বরে বলল, 'পত্রিকা-টত্রিকা পড়েন তো নাকি? না পড়লে অভ্যেস করুন। অন্তত নিজের বাবা কী করছে না করছে সেই খবরটুকু রাখা দরকার।'
'কী করেছে আমার বাবা?' আমি বললাম।
'একটা খুনির হয়ে কেস লড়ছে। আজকে পত্রিকায় কী নিউজ এসেছে, জানেন? এ পর্যন্ত নয়টি খুন করেছে ওই কিলার। প্রথমে পাঁচটা৷ তারপর জেলে বসে বসে আরো চারটা। লোকটা কী পরিমাণ ভয়ঙ্কর, ভাবতে পারেন? এমন লোকের তো ফাঁসি হওয়া উচিৎ। অথচ আপনার বাবা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে! এটা কি ঠিক, বলুন?'
'কিন্তু একজন মানুষ জেলে বসে বসে কীভাবে খুন করবে?'
'সেটা আপনার বাবাকে জিজ্ঞেস করুন।' বলে চলে যাচ্ছিল মেয়েটি। আমি বললাম, 'দাঁড়ান৷ এত তাড়াহুড়ো কীসের?'
মেয়েটি যেতে যেতে ফিরে তাকাল। একটু হেসে বলল, 'অনেক কাজ বাকি। কিছু একটা খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে মরতে হবে।' বলে দ্রুত পায়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
মেয়েটা বলে কীরে! মরতে হবে মানে? কী এমন জিনিস, যা খুঁজে না পেলে মরতে হবে? ও গড, মেয়েটি পৃথিবীতে ফিরে যাবার চাবির কথা বলেনি তো?
'এইযে রহস্যময়ী! দাঁড়ান একটু...'
মেয়েটি আর ফিরে এল না। না আসুক। আমি ভাবছি অন্য কথা। আমি মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি খুঁজছি, সে জানল কীভাবে? তবে কি সেই মেয়েটিই চাবির সন্ধান দেবে? না কি সে নিজেই মাইন্ড ট্রাভেলারের চাবি?
পরদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন একটা বিষয় আবিষ্কার করলাম। গত ক'দিনে আমার বয়স বহুগুণ বেড়ে গেছে। খেয়াল করে দেখলাম, শরীরের চামড়ায় ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। মাথায় কয়েকটা চুল পেকে গেছে। তাহলে কি দিন দিন আমার আয়ু কমে যাচ্ছে?
ইচ্ছে ছিল মাইন্ড ট্রাভেলের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় যাব। মায়ের সাথে দেখা করব। আরো কত কী! অথচ, আমি পড়ে আছি পাহাড়ের মাঝখানে। এদিকে যত দিন যাচ্ছে ততই মৃত্যুর পথে অগ্রসর হচ্ছি।
বাইরে এসে দাঁড়াতেই দেখলাম, দূর থেকে ইশারা করে ডাকছে কেউ একজন। এক ভদ্র মহিলা। কাছে যেতেই তিনি হাঁটতে লাগলেন। আশ্চর্য! কিছু না বলার থাকলে ডেকে আনল কেন? আমিও হাঁটতে লাগলাম তার পিছু পিছু। হাঁটা শেষ হলো কিছুটা দূরে নির্জন সমতল ভূমিতে গিয়ে। পায়ের নিচে ঘন সবুজ ঘাস।
'আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল তোমার, তাই না?' ভদ্রমহিলা বললেন।
'না তো! কে আপনি?'
'তোমার মা।'
দু'চোখ ভরে জল চলে এল। ইশ, যদি সত্যি সত্যি মা'কে সামনে পেতাম! নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, 'রসিকতা করছেন কেন? আমার মা থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। আর এটা বাংলাদেশ।'
ভদ্রমহিলা গম্ভীর গলায় বললেন, 'ওটা তোমার বাবার মনগড়া গল্প। আমি গত বাইশ বছর যাবৎ এখানে বসবাস করছি।'
'এখানে কোথায়?'
'এইতো এখানটায়। মাটির নিচে। এই কবরে।'
'কী!' কাঁপা গলায় বললাম, 'কীসব বানিয়ে বানিয়ে বলছেন! মৃত মানুষ কখনো কথা বলতে পারে?'
'না, পারে না। তবে আমি বলছি। কারণ, তুমি যা দেখতে পাচ্ছো তা বাস্তবে ঘটছে না। তুমি তাই দেখছো, যা তোমার মস্তিষ্ক তোমাকে দেখাচ্ছে। মরতে পারো জেনেও টার্ডে ক্যাপসুল খেয়েছিলে যাতে আমি অর্থাৎ তোমার মায়ের সাথে দেখা করতে পারো, তাই না?'
এবার আর বিশ্বাস না করে পারলাম না। ভাবতে ভাবতে আনমনে বললাম, 'কিন্তু বাবা বলেছিল, মা অস্ট্রেলিয়ায়। মারা গেছে তা তো বলেনি!'
'খুনি কখনো খুন করে বলে আমি খুন করেছি?'
'মানে!'
'ভালো করে চেষ্টা করে দেখ, মনে পড়বে। তোমার মাত্র চার মাস বয়স। বিছানায় শুয়ে শুয়ে চুপচাপ ঘুমাচ্ছিলে। কাচ ভাঙার শব্দে ঘুম থেকে জেগে হাত-পা ছুঁড়ে ওয়া ওয়া করে কাঁদতে লাগলে। দেখলে, তোমার বাবা আমাকে বিছানায় ফেলে গলা চেপে ধরেছে। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না...'
'এক মিনিট। বাবা খুন করতে যাবে কেন? তা-ও আবার মা'কে!'
'কারণ এই টার্ডে ক্যাপসুল। এটা তোমার বাবার নয় আমার আবিষ্কার। আমি জানতাম, ক্যাপসুল খেয়ে মস্তিষ্কে আটকা পড়ে মরতে হবে। তাই রিস্ক নেইনি। কিন্তু তোমার বাবা নাম কামাতে চেয়েছিল। এর জন্য মানুষ খুন করতেও প্রস্তুত ছিলেন তিনি। আর তাই ক্যাপসুল লুকিয়ে রেখেছিলাম। সে আমাকে জোর করছিল, ফিজিক্যাল টর্চার করছিল। কোনো মতেই যখন ক্যাপসুল দিতে রাজি হলাম না, তখন আমাকেই মেরে ফেলল। আমার লাশ এনে পুঁতে ফেলল এই নির্জন এলাকায়।'
'কিন্তু আমি তো তখন ছোটো ছিলাম। এতকিছু আমার মনে আছে কীভাবে?'
'ছোটো ছিলে, অন্ধ ছিলে না। তখন যা যা দেখেছো, সবকিছু তোমার মস্তিষ্কের একটা অংশে জমা পড়ে ছিল। টার্ডে ক্যাপসুল সেই তথ্যগুলো তোমাকে নতুন করে দেখাচ্ছে...'
'আপনি বলছেন, টার্ডে ক্যাপসুল বাবাকে দেননি। যার ফলে বাবা আপনাকে খুন করেছে। যদি সত্যিই তাই হয়, এত বছর পর বাবা ক্যাপসুলটা পেল কোথায়?'
ভদ্রমহিলা উদাসীন ভাবে বললেন, 'সেটা আমিও ভেবে পাচ্ছি না।'
'আচ্ছা, টার্ডে ক্যাপসুল যদি আপনার আবিষ্কার হয়, এর চাবিওতো আপনার কাছে থাকার কথা। তাই না?' আমি বললাম।
'না, নেই। নেই বলেই তো ক্যাপসুলটা লুকিয়ে রেখেছিলাম।'
'তাহলে কি আমি আর ফিরে যেতে পারব না? অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হবে আমাকে?'
'পারবে। চাবির সন্ধান করো। হয় চাবি বের করো নাহয় মরো।' বলে ভদ্রমহিলা অদৃশ্য হয়ে যেতে লাগলেন৷ যেতে যেতে বললেন, 'একবার মা বলে ডাকো। একবার..'
আমি চোখের পানি ছেড়ে হাউমাউ করে বললাম, 'মা!'
(চলবে)


[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.