
গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : দুই)
মো. ইয়াছিন
চোখ খুলেই নিজেকে পুকুরপারে আবিষ্কার করলাম। পড়ন্ত বিকেল। বাঁশের মাচায় বসে আছি। আমার পাশে, পুকুরের টলটলে জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে এক যুবতী।
মাই গড! এ-তো সেই মেয়ে, যাকে এতদিন মনে মনে কল্পনা করেছি। মেয়েটিকে নিয়ে কত ভাবনা ছিল আমার। কত স্বপ্ন বুনেছি তাকে ঘিরে। আজ সে সত্যিই সামনে বসে আছে, ভাবতেই গা শিউরে উঠে। তবে কি সত্যি সত্যি মাইন্ড ট্রাভেল করছি?
'আপনি কি এখানে রোজ আসেন?' মেয়েটি বিনীত গলায় বলল।
আমি কী বলব? বাবার আবিষ্কৃত টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে এখানে এসেছি। এটা আমার কল্পনার জগৎ। বাস্তবের সাথে এর কোনো মিল নেই। আমি আপাতত আমার মস্তিষ্কে বিচরণ করছি। আগামী চব্বিশ দিনের মধ্যেই আমাকে ফিরে যেতে হবে। যা পৃথিবীর সময়ে প্রায় চব্বিশ ঘন্টা। এসব বলব? বললে হয়তো হেসে উড়িয়ে দেবে। পাগলও ভাবতে পারে। তাই সত্যিটা লুকিয়ে রাখলাম।
প্রথম কথাটাই শুরু হলো মিথ্যে দিয়ে, 'হ্যাঁ, আমি রোজ এখানে আসি। এখানকার পরিবেশ আমাকে খুব টানে। এখানে এলে মনে হয়, অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছি।'
মেয়েটি অমায়িক হেসে বলল, 'আমারও তাই মনে হয়। দূর থেকে দেখেই বুঝেছিলাম, জায়গাটা সুন্দর। তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। এসে দেখি, কাছ থেকে আরো বেশি সুন্দর।'
'আপনিও অনেক সুন্দর...'
কথা শেষ হবার আগেই সে পা দিয়ে কয়েকবার পানিতে আঘাত করল। মুহূর্তেই পুকুরের নীরব জলে শব্দের সঞ্চার হলো। একের পর এক ঢেউ ছুটে যেতে লাগল। সেই ঢেউয়ের শব্দে তাল মিলিয়ে সে আমায় বলল, 'আমি এদিকটায় নতুন।'
বলে শান্ত হয়ে গেল। পুকুরের জল এখনও নড়ছে। নিঃশব্দে। আমি তাকিয়ে আছি মেয়েটির দিকে। আর সে, উদাসীন ভাবে তাকিয়ে আছে দূর আকাশে। পুকুরের ওপারে বিদীর্ণ ফাঁকা মাঠে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা উড়ে উড়ে বসছে। হঠাৎ মনে হলো, কোথায় আছি আমি?
'এটা কি অস্ট্রেলিয়া?' কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম।
মেয়েটি আরো একবার পুকুরের জলে পা নাড়াল। ঘুরে বসল আমার দিকে। বলল, 'আপনি খুব মজার মানুষ। বুঝতে পারছি, আমার মন ভালো করার চেষ্টা করছেন। তবে আমার মন খারাপ ছিল না কখনো।' বলে আবারও উদাসীন ভাবে দৃষ্টি রাখল আকাশে।
শিট শিট! অযথা লজ্জা পেলাম। একটু আগেই তো মেয়েটির সাথে বাংলায় কথা বললাম। অস্ট্রেলিয়ায় বসে কেউ বাংলায় কথা বলবে?
মেয়েটি হঠাৎ উঠতে উঠতে বলল, 'ভালো লাগল আপনার সাথে দেখা হয়ে।'
'আপনি থাকেন কোথায়?' আমি দ্রুত জিজ্ঞেস করলাম।
'দূরে। অনেক দূরে। আসি।' বলে ধীর পায়ে চলতে লাগল। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলাম তার দিকে। সে যাচ্ছে। যেতে যেতে হারিয়ে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে থেকে।
এখানেই শেষ হতে পারত তার সাথে আমার কথোপকথন, পরিচয়পর্ব, মেলামেশা সবকিছু। কিন্তু তার ফেলে যাওয়া এমপি থ্রি ডিভাইস অন্য কথা বলছে। এটা ফিরিয়ে দেবার জন্য আরো একবার দেখা হবে।
বাঁশের মাচায় পড়ে থাকা এমপি থ্রি ডিভাইস এবং হেডসেট হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। পকেটে রাখার ঠিক আগ মুহূর্তে চমকে উঠলাম। আমার পকেট-ই নেই! পরে আছি লুঙ্গি। লুঙ্গি পরা অবস্থায় মেয়েটি আমাকে দেখেছে! কী লজ্জা! পুরুষ মানুষ হয়ে লুঙ্গি পরতে লজ্জা লাগাটা একটু অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবে আমার জন্য লুঙ্গি পরাটা অস্বাভাবিক। ছোটোবেলা বিশেষ কারণে কয়েকটা দিন লুঙ্গি পরেছিলাম। এর পর আর কখনো লুঙ্গিতে হাত লাগাইনি। গোসল শেষে টাওয়াল তো আছেই!
লজ্জা আরো বাড়ল যখন দেখলাম আমি খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ মেয়েটি তাহলে আমাকে খালি গায়ে লুঙ্গি পরা অবস্থায় দেখেছে! কী একটা বিব্রতকর অবস্থা উফ! এরচে' দেখা না হলেই ভালো হত। অন্তত লজ্জা পেতে হত না।
'এ্যাই মিরাজ, বাসায় যাবি না?' কিছুটা দূর থেকে বাবা বললেন।
বাবার পরনে উকিলের পোশাক। হাতে কালো ব্রিফকেস। আমি বললাম, 'উকিলের পোশাক পরে কোথায় গিয়েছিলে?'
'ওকালতি করব অথচ উকিলের পোশাক পরব না? আচ্ছা, তোর মাঝে মাঝে কী হয়ে যায় বল তো?' বাবা ভ্রু কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন।
বাবা ওকালতি করছেন। তার মানে উকিল। ইয়াহু! এতকাল আমি এটাই ভেবেছি, ইশ, বাবা যদি গম্ভীর টাইপ বিজ্ঞানী না হয়ে হাসিখুশি এক উকিল হত! সব বিজ্ঞানী গম্ভীর কিংবা সব উকিল হাসিখুশি এমন না। আমার বাবা গম্ভীর মানুষ তাই এরকম ইচ্ছে। যাইহোক, ইচ্ছেটা শেষমেশ পূরণ হলো। বাবা উকিল। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি হেসে হেসে কথা বলছেন৷ যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।
'কীরে কীসব বিড়বিড় করছিস?'
'না বাবা, কিছু না।' বলে হাঁটতে শুরু করলাম। বাবা আগে আগে হাঁটছেন। আমি তার পিছু পিছু। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আঁধার নামবে।
জঙ্গলাবৃত্ত পাহাড় বেয়ে এঁকেবেকে বয়ে গেছে সরু পথ। সেই পথ দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে একসময় যখন পাহাড়ের চূড়ায় চলে এলাম, হাঁফ ছেড়ে তাকিয়ে দেখি একটা বাড়ির সামনে চলে এসেছি। বাবা কাঠের বেড়া ঠেলে ভেতরে চলে গেলেন। আমি গেলাম তার পিছু পিছু। প্রায় হাঁটু সমান উঁচু কাঠের মাচায় উঠলাম। বাবা পকেট থেকে চাবি বের করে দরজায় ঝুলানো তালা খুলে ভেতরে গেলেন। আমি অসতর্কতার বশে দরজার সামনে লাগানো চৌকাঠে বাধা পেয়ে অনেকটা পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ালাম। তৎক্ষনাৎ পায়ের নিচের কাঠের মাচা কেঁপে উঠল। খচখচ শব্দ হলো ঘুণে কাটা তক্তা থেকে। পুরো বাড়িটাই দাঁড়িয়ে আছে কাঠের মাচার উপর। কী অদ্ভুৎ! আমি কল্পনায় যা যা ভাবতাম সবকিছু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। একদম স্বচ্ছ, নিখুঁত। স্বপ্নের মতো তবে সত্যি।
দু'পাশে দু'টো ঘর। মাঝখানে যে ঘরটায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি, এখানে একটি চারকোনা ছাদের টেবিল এবং দু'টো চেয়ার ব্যতীত কিছুই দেখতে পারছি না।
বাবা ডান দিকের ঘরটায় চলে গেলেন। তাহলে বাঁ দিকের ঘরটা আমার। এগিয়ে যেতে লাগলাম। দেখা যাক, আমার ঘরে কী কী আছে। ভেবেছিলাম আর কিছু না থাকলেও একটা গিটার অন্তত থাকবে। কিন্তু এ ঘরে এসে দেখি কিছুই নেই। একটা কাঠের টেবিল। টেবিলের সামনে একটি চেয়ার। শোবার বিছানাটাও কাঠের তৈরি। চারপাশের দেয়াল, সেটাও কাঠ দিয়ে বানানো। জীবনটা কাঠময় হয়ে গেল! মাথার উপর ছাদও কি কাঠের?
নাহ্! বাঁচা গেল। মাথার উপর টিনের চাল। যাইহোক, এই একটা জিনিস অন্তত কাঠের না।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই চোখে ঘুম জুড়ে এল। আমি চোখ বন্ধ করে রাখলাম কিছুটা সময়। উঠে দাঁড়িয়ে বিছানার পাশে থাকা কাঠের আলনা থেকে টি-শার্ট নিয়ে গায়ে জড়িয়ে দিলাম। একটা কালো জিন্স পরে লুঙ্গিটা একটানে খুলে ফেললাম। আঃ, এবার শান্তি। টেবিলের ড্রয়ার টান দিয়ে অচেনা মেয়েটির ফেলে যাওয়া এমপি থ্রি প্লেয়ার রেখে আবারো বিছানায় শুতে যাচ্ছিলাম, তখনই চোখে পড়ল, বিছানায় পাশাপাশি দু'টো বালিশ সাজিয়ে রাখা। একটাতে নাহয় আমি ঘুমাই। আরেকটাতে? আমি ব্যতীত আর কেউ কি থাকে এ ঘরে?
(চলবে)