গল্পঃ "নবজন্ম" (২৬তম পর্ব)
লেখকঃ আজিজুর রহমান
কুন্তি সকাল থেকে চুপচাপ বসে আছে। মেমসাবকে দেখেছে একপলক কেমন হবে মনে দুশ্চিন্তা। সিলেটের কথা অনেক শুনেছে দেখার শখ অনেক দিনের। চা বাগানে কয়েক বছর কাজ করেছে।বাগানের অবস্থা ভাল নয় তাই রোহনচাচার সঙ্গে চলে এসেছে। চাচা বলেছে মেমসাব খুব বড় ডাক্তার। নার্সিং হোমের সামনে গাড়ী থামতে দেখল মেমসাব নামছেন। কি করা উচিত ভেবে পায়না। তার মধ্যেই মেমসাব কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, কি নাম তোমার?
জ্বি কুন্তি ।
উপরে এসো।
ড.এমার সঙ্গে সঙ্গে কুন্তি উপরে উঠে ঘরে ঢুকতেই তাকে জিজ্ঞেস করা হল,গ্যাসে চা করতে পারবে কিনা?কুন্তি ঘাড় নেড়ে সায় দিতেই এমা বললেন,তিন কাপ চা বানাও।
রান্না ঘরে নিয়ে সব দেখিয়ে দিয়ে সোফায় এসে বসলেন। এমার এ্যাটাচি নিয়ে অভি ঢুকে জিজ্ঞেস করে,চা খাবে তো?
এমা হাত দিয়ে ইশারায় বসতে বলল। ইতিমধ্যে কুন্তি চা নিয়ে ঢোকে অভি বুঝতে পারে এজন্য তাকে চা করতে বলেনি। চায়ের কাপ নিয়ে অভি জিজ্ঞেস করে,তোমার নাম কি বোন?
অভির বলার ঢঙে কুন্তি মুচকি হেসে বলল,কুন্তি।
এমা লক্ষ্য করছিল, অভি সবাইকে মর্যাদা দিয়ে কথা বলে এটা ভাল লাগে। কুন্তির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,চা আছে তো?তুমি খেয়ে নেও।
মোবাইল বাজতে এমা দেখে ফোন কেটে দিল। ফোন আসছে এমা কেটে দিচ্ছে অভির নজরে পড়ে। ড.হালদারের কথাগুলো মনে মনে নাড়াচাড়া করে এমা। সমাজের অনাচার পাপাচারের মাঝে ভালো মানুষগুলো যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। আইন আদালত সবকিছু যেন টাকার গোলাম হয়ে আছে। কোথায় আছে ন্যায়বিচার? কোথায় সেই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর? সবকিছু যেন ধুলোর সাথে হারিয়ে যাচ্ছে। নামমাত্র ন্যায়বিচার আর মানদণ্ড দাঁড়িয়ে আছে সমাজের মাঝে। সমাজের উচ্চা-আঙ্খাকিত মানুষগুলো স্বৈরাচারী এবং মুখোশের আড়ালে এক ধরণের নিষ্ঠুর পশু লুকিয়ে আছে। চোখ তুলে অভিকে দেখল। হা-করে কেমন চেয়ে আছে মনে মনে হাসে এমা। আবার ফোন বেজে উঠল। অভি বলল,ফোন ধরছো না কেন বলতো?
এমা হেসে ফোন ধরে বলল,হ্যালো?–হু ইজ দিস?—স্যরি আই কান্ট রিকগনাইজ ইউ–উইল ইউ প্লিজ টেল মি ইয়োর নেম?—নো মি ফ্রম সিলেট নট ঢাকা—-হু গিভ দিস নাম্বার–নো আই কাণ্ট রিমেম্বার হোয়াট ইউ সে–টক উইথ মাই হাবি–। এমা ইশারায় অভিকে কথা বলতে বলল। অভি ফোন নিয়ে হ্যালো বলতে,ওপাশ হতে ফোন কেটে দিল। অভি অবাক হয়ে বলল,কেটে দিল।
এমার সন্দেহ হয় এর পিছনে মম নেইতো?এতকাল পর রাজ ফোন করছে ,এই নম্বর ওকে দিল কে? অভি ফোন ফিরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,কার ফোন?
দ্যাট স্কাউণ্ড্রেল রাজ মির্জা।
এমা একটা কথা জিজ্ঞেস করব তুমি বিরক্ত হবে নাতো?
তুমি জানতে চাইছো পছন্দ নয় যখন তাহলে তখন কেন আপত্তি করিনি?
অভব অবাক হল এই প্রশ্নই সে করতে যাচ্ছিল। এমা ঠোঁট চেপে অন্যদিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবতে থাকে। তারপর হেসে বলল,তোমার প্রশ্ন স্বাভাবিক। আমিও ভেবেছি কেন ওর সঙ্গে বিয়েতে সম্মতি দিলাম?আসলে মম যখন বিয়ের কথা বলল,বিয়েটা খুব সিরিয়াসলি নিইনি। বাট নাউ বুঝেছি জীবনে সঙ্গীর গুরুত্ব। তোমাকে বিকশিত হতে সাহায্য করবে অথবা ধ্বংস করে দেবে। আর এখন তো কারো কথা ভাবার প্রশ্ন আসেনা।
ডাক্তার এমাকে নতুন করে চিনছে অভি। ও যে এভাবে চিন্তা করতে পারে বাইরে থেকে বোঝা যায়না। বাইরে ম্যানেজার সাহেবের গলা পেয়ে এমা বলল,আসুন।
তারেক সাহেব ঢুকতে এমা বসতে বললেন। তারেক সাহেব বললেন,ম্যাম কাল ম্যাডাম চেয়ারপারসন আসছেন সন্ধ্যের ফ্লাইটে।
কখন বলল?
পুলিশ চলে যাবার পর ফোন করেছিলাম।
ব্যাপারটা মিটেছে?
তারেক সাহেব হাসলেন ভাবটা এটা কোনো ব্যাপার নয়।বললেন,এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না আমি ভাবছি কাল কল্যাণিতে আপনার অপারেশন আছে।
সেতো দুপুরে মম আসছে সন্ধ্যেবেলা। তারেক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পেরে বললেন,রোহন সকালে আমাকে পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে। তারপর সেই গাড়িতে মমকে আনতে যাবেন। আমি ফেরার পথে ট্যাক্সি নিয়ে চলে আসব।
কিন্তু ম্যাম আপনি একা?তারেক সাহেব ইতস্তত করেন।
সঙ্গে মি.অভি থাকবে। সমস্যা নেই। আর কিছু?
স্যার সঙ্গে থাকলে আর চিন্তা কি?আরেকটা কথা চেয়ারপারশন বলছিলেন ট্রাস্টি হতে রোহনকে নিয়োগপত্র দিতে–।
রোহন ড্রাইভার। এ্যাম্বুলেন্স ছাড়া ট্রাস্টির গাড়ি নেই। রোহন কি এ্যাম্বুলেন্স চালাবে?
না মানে আপনার গাড়ী–।
মি.তারেক গাড়ী আমার আমি নিজে গাড়ী চালাতে পারি। এতদিন আমি রোহনের পেমেণ্ট করেছি সেটা বদলাবার দরকার নেই। ওকে?
ম্যাডাম চেয়ারপারসন বলছিলেন তাই বললাম। আচ্ছা আসি?
তারেক সাহেব যেতেই অভি বলল,আমাকে নিয়ে যাবে বলোনি তো?
অসুবিধে থাকলে যাবে না।
আমার কাল ক্লাস আছে। কালকেও কামাই করব?
এমা কথার কোনো উত্তর না দিয়ে শোবার ঘরে চেঞ্জ করতে গেল।চেম্বারে বসার সময় হয়ে গেছে। নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকেন ড.এমা। সময়ের ব্যাপারে অত্যন্ত পাঙ্কচুয়াল।
অভি চুপ করে গেল। অসুবিধে থাকলে যেতে হবে না। এরপর কি বলবে?অভি বেরিয়ে রাস্তার মোড়ের দিকে গেল। কোহিনূর ফার্মেসী কেমন চলছে দেখে আসা যাক। এমার ব্যাপারটা এরা সবাই জেনে গেছে। অবশ্য স্পষ্ট করে মুখের উপর কেউ কিছু বলে না। বেশ রাত পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে কোহিনূরের হাতে চা খেয়ে ফিরে এসেই এমার মুখোমুখি।
খালি ক্লাস করলে হবে পড়তে হবে না?
এমাকে এ্যাক্টিভ ভুমিকায় দেখে ভাল লাগলো। অসুবিধে থাকলে যেতে হবেনা এই প্যাসিভ ভুমিকা ভালো লাগেনি। অভি বই নিয়ে চলে যাচ্ছিল এমা বলল,থাক রাত হয়েছে। এখন খেতে এসো। খেতে বসে এমা করুনভাবে বলল,নিজের জন্য না হোক অন্তত আমার কথাটা একটু ভেবো।
অভি জড়িয়ে ধরে বলল,আমার জন্য তোমাকে লজ্জা পেতে হবে না।
কি হচ্ছে কি তুমি তো এখনি লজ্জায় ফেলছো। কুন্তি আছে না?
খাওয়া-দাওয়া শেষ কুন্তি বাসনপত্তর গোছাচ্ছে। এমা বিছানা ঠিক কোরে সোফায় বসল। কুন্তি চলে যাবার পর অভি সোফায় এমার উল্টোদিকে মুখ করে বসল।
অভি হাসলো রাগ করেছে এমা। অভি দু'হাত বাঁড়িয়ে এমাকে জড়িয়ে ধরতেই তার বুকে মিশে গেল। অভি বুঝতে পেরেছে এমার দু'হাত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। তারমানে এমার রাগ শেষ হয়ে গেছে। এতে অভি মনে মনে হেসে উঠলো। একটি আলিঙ্গন যেন সব বাঁধা নিষ্কুলতা যেন ধুঁয়ে মুছে দেয়। থাকে না মনের কোণে ভালোবাসা মানুষের প্রতি রাগ অভিমান।
চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজে চোখ বুলালো। প্রথিতযশা অস্ত্র চিকিৎসক ড.এমা খন্দকার ঘটনাকে দুঃখ জনক বলে বর্ণনা কররেছেন। অভি হাসলো এমা ভাগ্যিস বাংলা পড়তে পারেনা। এই ঘটনায় ম্যাটাডোরের ড্রাইভারকে পুলিশ আটক করেছে। পুলিশের ধারণা এই ম্যাটাডরেই ধর্ষন করেছে দুষ্কৃতিরা।সংখ্যায় তারা ছিল তিনজন। পুলিশ তাদের অনুসন্ধান করছে।
ইউনিভার্সিটির ক্যাণ্টিনেও অনেকে সংবাদদুটির বীভৎসতা নিয়ে আলোচনা করছে। কল্পনার সঙ্গে দেখা হতেই কদিন কি কি ঘটেছে বিস্তারিত বলতে থাকে। সবুজ ওর বাবার কথা মত মুকুন্দ সাহেবকে বাড়ীতে নিয়ে গেছিল। তখনও কিছু জানতো না বাবা। সাইদ সাহেবের কাছে সমস্ত ঘটনা শুনে বাবা নাকি কেঁদে ফেলেছিল, সবুজের কাছে শোনা। হবু শাশুড়ি খুব আদর যত্ন করেছে বাবাকে। শাশুড়ী বলেছে বউমা এখন বাপের বাড়ী পড়ে থাকবে কেন?
তাহলে তো মিটেই গেল। অভি অন্য মনষ্কভাবে বলল।
সবুজ বলছে এ্যাবরশন করতে,জেনে বুঝে একটা জলজ্যান্ত প্রাণ বলুন তাই করা যায়?
অভির মন অন্য জগতে এমা একা একা অতদুর যাবে ভেবে স্বস্তি পাচ্ছিল না। কল্যাণী কি এখানে প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়িয়ে যেতে হয়।অতদূর যাওয়ার দরকার কি?অনেক টাকা দেবে। এমার কি টাকার খুব লোভ?
কিছু বললেন নাতো?কল্পনা বলল।
এ্যাবর্শন তো হত্যা–। অভিকে থামিয়ে দিল কল্পনা। পর্ণা এদিকে আসছে দেখিয়ে বলল পরে কথা হবে।
পর্ণা আসতে কল্পনা উঠে দাড়ালো। পর্ণা জিজ্ঞেস করে,আমি এলাম বলে চলে যাচ্ছো?
তা নয় আমার ক্লাস আছে। তোমরা কথা বলো। কল্পনা চলে গেল।
পর্ণা বসতে বসতে হেসে বলল,তোমার ক্লাস নেই তো?
আছে তবে যাবো না। অভি হেসে বলল।
বেয়ারাকে ডেকে দুটো চা বলল পর্ণা। অভি ঘড়ি দেখছে মনের মধ্যে অস্থিরভাব।
আজকের কাগজ দেখেছো?পাশবিক ব্যাপার!!
অভি বুঝতে পারে কার কথা বলছে। বেয়ারা চা দিয়ে গেল। পর্ণা বলল,কাগজে যা ঘটে তার সিকিভাগ বেরোয়। মহিলার কিছু দোষ না থাকলে খালি খালি কেউ অমন করে?
হয়তো আছে সেটা পাশবিকতার সাফাই হতে পারে না।
তুমি মেয়েদের ব্যাপারে একটূ সফট। সেই মেয়েটি খুব লাকি।
কোন মেয়ে?
ওই যে সেদিন বললে এমা না কি নাম?
অভব হাসলো পর্ণা মনে রেখেছে নামটা। প্রসঙ্গ এড়াতে জিজ্ঞেস করে,তোমার বন্ধু রজত আজ আসেনি?
এসেছে। এখানেই আসার কথা। ইণ্টারেস্টিং কাগজে ড.এমার বক্তব্য দিয়েছে দেখেছো?
অভি উঠবে কিনা ভাবছে পর্ণা হাসতে হাসতে শ্লেষের সুরে বলল,তোমার এমা এই ডাক্তার এমা নয়তো?
অভি বলল,আমাকে উঠতে হবে।
এই রাগ করলে?বোসো-বোসো আমি মজা করলাম। ড.এমা একজন বড় ডাক্তার আমি জানি। তোমার সঙ্গে একটু ঠাট্টাও করা যাবে না?
রাগ করিনি। জরুরী কাজে যেতে হচ্ছে। দুরে রজতকে আসতে দেখে বলল,ঐতো এসে গেছে আসি?
অভব মনে মনে ভাবে যদি বলতো ড.এমাই তার প্রেমিকা তাহলে তাকে পাগল ভাবতো।
সময় হয়ে গেছে এমা প্রস্তুত। অভিকে নিয়ে একটা প্লান ছিল। মনে মনে বাতিল করে দিল। আরেকদিন করা যাবে। নীচে দেখল ট্রাস্টির উকিল মি.নিলয় দাঁড়িয়ে চোখাচুখি হতে হাসলেন।
ড.এমা জিজ্ঞেস করলেন,আপনি?
হাইকোর্ট হতে আসছি। মি.তারেকের জরুরী তলব। আজ আবার চেয়ার পারসন আসছেন।
সেতো সেই সন্ধ্যেবেলা।
এলাম একটু আড্ডা হবে অনেকদিন আসিনা।
ড.এমা হেসে কিছুটা গিয়ে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করেন,আচ্ছা মি.নিলয় রেজিস্ট্রি বিয়ের পর বহুকাল যোগাযোগ নেই তা হলেও বিয়ের দাবী করা যায়?
দেখুন ম্যাম আমি ক্রিমিন্যাল প্রাক্টিশ করি। তবে যতদুর জানি ছ-মাস বিচ্ছিন্ন থাকলে বিয়ে আপনা হতেই অসিদ্ধ। এমন কি সন্তানের প্রতিও দাবী করতে–।
না না একদিনের জন্য কনজুগ্যাল লাইফ কাটায়নি। সন্তান দুরের কথা।
তাহলে তো প্রশ্নই আসছে না। তবু আপনি সিভিল লইয়ারের কথা বোলে নেবেন।
থ্যাঙ্ক ইউ মি.নিলয়।
ড.এমা দেখলেন গাড়ীর বাইরে রোহন তার জন্য অপেক্ষা করছেন।গাড়ীর কাছে যেতে রোহন পিছনের দরজা খুলে দিলেন। মাথা নীচু করে ঢুকতে গিয়ে চমকে উঠে কোনোমতে নিজেকে সামলে ভিতরে ঢুকে বসলেন। বা-দিকের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। গাড়ী চলতে শুরু করল। আস্তে হাত বাড়িয়ে এমার ডান হাতটা কোলে তুলে নিল অভি।
মুখ না ঘুরিয়ে এমা জিজ্ঞেস করেন,ক্লাস শেষ হয়ে গেছে?
এমার আঙুল ফোটাতে ফোটাতে বলল অভি,ক্লাস না করে চলে এসেছি।
চলে এলে ক্ষতি হবে না?
একা একা অতদুর থেকে ফিরবে কিছু হলে ক্ষতি তো আমারই হবে তাই না?
এমা মুখ টিপে হাসে কথার ওস্তাদ। রাস্তা ফাকা পেয়ে রোহন গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। জানলা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসে। বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অভির চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। এমার নজরে পড়ে জানলা ঘেষে বসে ঝিমোচ্ছে। ইশারায় নিজের কোল দেখালো। অভি হেসে এমার কোলে মাথা রেখে শরীর এলিয়ে দিল।পিছন দিয়ে হাত ঢুকিয়ে এমার কোমর জড়িয়ে ধরে যাতে পড়ে না যায়। পর্ণা দেখলে অবাক হয়ে যেতো। মায়ের কথা মনে পড়ল ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোটো ছিল। মা বোনের আদরে বড় হয়েছে।মা মারা যাবার পর বড় বোনের আশ্রয়ে পরগাছার মত কেটেছে জীবন। পুরানো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল অভি। গাড়ী তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে।
কল্যানী শহরের কাছাকাছি আসতে রাস্তার দু-ধারে নজরে পড়ল দোকান পাঠ। একসময় হেলথ কিয়োর নার্সিং হোমের নীচে গাড়ী থামল। অভিকে ঠেলে ঘুম থেকে তুলে গাড়ী থেকে নেমে রোহনকে বললেন,আপনি চলে যান আর আসার দরকার নেই।
একটা বাই পাস সার্জারি ছিল। পেশেণ্টের ইচ্ছে অনুযায়ী ড.এমাকে ডাকা হয়েছে। ঘণ্টা দুয়েক পর নার্সিং হোম হতে বেরলো ওরা। তারপর রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে। অভি জিজ্ঞেস করল,হেঁটে যাবে নাকি?
সে কথার উত্তর না দিয়ে এমা জিজ্ঞেস করে,তোমার ছোট বোনের গায়ের রঙ তোমার মতো?
কে বিদিশা? বিদিশা আমার চেয়ে ফরসা গ্রামে থাকে বোঝা যায়না।
এমা হাত বাড়িয়ে বলল,এরকম?
ঝা তোমার মত নয়।
ওরা একটা শাড়ীর দোকানে ঢুকল। দুটো ঢাকাই জামদানী শাড়ি পছন্দ করে এমা ব্যাগে ভরে টাকা মিটিয়ে বলল,এবার স্টেশন চলো।
অভির বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। নীরবে অনুসরণ করে এমাকে। সারা রাস্তা এমার কোলে শুয়ে এসেছে। তারপর অপারেশন করল এত পরিশ্রমের পরও চনমনে। প্রতন্ত্য অঞ্চলের স্টেশন আসতে নেমে পড়ল। স্টেশন হতে বেরিয়ে একটা মিষ্টির দোকান হতে একহাড়ী রসগোল্লা কিনল অইি হাত বাড়িয়ে নিতেই দিয়ে এমা বলল,তুমি পারবে না আমাকে দাও।
অভির মেজাজ গরম হয়ে যায় সব সময় গার্জেনগিরি উষ্ণস্বরে বলল,কেন পারবো না?
অভির চোখের দিকে তাকিয়ে থমকে গেল এমা পরমুহূর্তে মুখে হাসি টেনে বলল,ওকে। এটাও নেও। হাতের এ্যাটাচি হাতে দিয়ে কাধের ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে দিল। অভি কিছু বলল না।
অভি অটো স্ট্যণ্ডের দিকে যাচ্ছিল পিছন থেকে ডেকে এমা একটা রিক্সা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,এটা যাবে না?
অভির কান্না পেয়ে যায় কাকে নিয়ে এসেছে?এখন ভয় হচ্ছে বিদিশার বাড়ি গিয়ে আবার কি করে বসে। একহাতে মিষ্টির হাড়ি অন্য হাতে এ্যাটাচি কাধে ঝুলছে লেডিস ব্যাগ অভিকে দেখে মনে মনে খুব মজা পায়। দুজনে রিক্সায় উঠতে অভি বলল, বেশি ভাড়া দেব চলো।
সান্ধ্যের একটু আগে প্লেন ল্যাণ্ড করল,লেট করেনি। যাত্রীদের বহির্গমন পথের দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তারেক সাহেব।ম্যাডাম লিলির সঙ্গে চোখাচুখি হতে হাত নাড়লেন।
বাইরে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করেন,ডাক্তার ম্যাম আসেনি?
ওর জরুরী অপারেশন আছে।
তারেক সাহেব ফোন করে রোহনকে ডাকলেন। পার্কিং-এ অপেক্ষা করছিল রোহন। গাড়ি এসে থামতেই রোহনকে দেখে ম্যাডাম লিলি জিজ্ঞেস করেন,গাড়ি নিয়ে যায়নি?
রোহন পৌঁছে দিয়ে চলে এসেছে।
হোয়াট? মিমি একা আসবে?
মি.অভি সঙ্গে আছেন হি ইজ ভেরি রেস্পন্সিবল।
গাড়িতে উঠে বসতে রোহন স্টার্ট করল। দ্যাট বাঙালি বয়। মনে মনে ভাবেন ম্যাডাম লিলি। মেয়েটা বড় জিদ্দি ওর গ্রাণ্ডমমের মত।
তাদের প্রপার্টি মমই বাড়িয়েছে। মমই অনেক হিসেব করে রাজনের সঙ্গে তার বিয়ে দিয়েছে। রাজন আর যাইহোক ভায়লেণ্ট নয়।
এমনিতে খারাপ নয় সে একটু লোভী টাইপ। অবশ্য রাজ ছেলেটাও খুব লোভী। এখন লণ্ডনে আছে শুনেছে এফআরসিএস করেনি।সুযোগ দিলে দেশে ফিরে আসবে বলছিল। মিমি রাজি হবে না জানে।
বিদিশা ছেলেকে নিয়ে শুয়ে আছে। সুবি স্কুলে গেছে ডাক্তার কোথায় গেছে কে জানে?ছেলেটার বৃদ্ধি হচ্ছে না। সব সময় ঘুমায়। সময় হয়ে গেছে এখুনি ফিরবে সবাই। উঠি-উঠি করছে এমন সময় বাইরে থেকে মনে হল কে যেন “আপু-আপু” বলে ডাকছে। মেয়েলি গলায় তাকে আপু বলে কে ডাকবে?বাইরে বেরিয়ে এমাকে দেখে অবাক। চীনেদের মত দেখতে অথচ পরিষ্কার বাংলা বলছে।
আপু আমাকে চিনতে পারোনি কিন্তু আমি তোমাকে চিনতে পেরেছে।
চিনতে না পারলেও মেয়েটিকে ভাল লাগে কি সুন্দর হাসি,রূপোর মত ঝকঝকে দাতের সারি। অভিকে আসতে দেখে স্বস্তি বোধ করল বিদিশা। অভি মিষ্টির হাড়ি নামিয়ে রেখে বলল, বিদিশা এর নাম এমা।তোকে পরে সব বলব। এক গেলাস পানি দে।
দুটো মোড়া নিয়ে দুজনে বসল। এমা জামরুল গাছের দিকে তাকিয়ে দেখল সাদা থোকা থোকা জামরুল ঝুলছে। বিদিশা দু-গ্লাস জল এনে দিয়ে বলল,জামরুল খেতে বেশ সুন্দর। ওর দোলাভাই আসুক পেড়ে দিচ্ছি। ভাই তুই ভিতরে আয়। ওকে একটু ভিতরে নিয়ে যাই?
ওহ সিয়োর এতদিন পর ভাই এল। এমা হেসে বলল।
বিদিশার সঙ্গে অভিও ভিতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষন পর সুদেব ছেলেকে নিয়ে ফিরে বারান্দায় এমাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে কোথায় দেখেছি মহিলাকে?
স্টেশনে একজন হকার ট্রেন থেকে পড়ে কোমরে লেগেছিল কয়েকজন তাকে একটা নার্সিং হোমে নিয়ে যায় তারমধ্যে সুদেবও ছিল। সেখানে ড.এজাজ চিকিৎসা করেছিল। মনে পড়েছে এই মহিলা ড.এমা কিন্তু এখানে কেন?সুদেব ঘরে ঢূকে গেল কিন্তু সুবি বই রেখে এমার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,তুমি কে?
আমি এমা। তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
ক্লাস ফাইভ।
এটা কি গাছ?
জামরুল গাছ। তুমি জামরুল খাও?
কোথায়?
দাড়াও দিচ্ছি। সুবি জামরুল গাছে উঠে গেল।
এমা নীচে দাঁড়িয়ে উপর দিকে তাকিয়ে থাকে। সুবি জামরুল ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে থাকে আর এমা নীচে দাঁড়িয়ে লুফতে থাকে। হঠাৎ লাফ দিয়ে একটা ডাল ধরে জামরুল সমেত একটা ডাল ভেঙ্গে নিল।
সুদেব ভিতরে গিয়ে অভিকে জিজ্ঞেস করে,বাইরে বসে উনি ড.এমা?
অভি বলল,হ্যা তুমি কি করে চিনলে?
সবাই বাইরে এসে কাণ্ড দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বিদিশা ভাইকে বলল,এ মেয়ে তোকে সামলাতে পারবে।
এখানে এরকম নার্সিং হোমে একেবারে অন্যরকম। বিশ্বাসই হবে না দুজনে এক। অভিও বেশ অবাক হয়েছে এমাকে এভাবে দেখে। গোটা সাত-আট জামরুল সমেত ডালটা নিয়ে খুব খুশি খুশি লাগে।
উনি তোমাকে বিয়ে করবেন?সুদেব জিজ্ঞেস করে।
বলছে তো তাই। অভি হেসে বলল।
একটা পাত্র নিয়ে এমার কাছ থেকে জামরুলগুলো নিতে গেলে ডালটা রেখে বাকী জামরুল দিয়ে দিল। জলে ধুয়ে একটা বাটিতে এমার হাতে দিয়ে বলল,খেয়ে দেখো কেমন লাগে।
আপু আমাকে তোমার কেমন লাগল?
বিদিশা হেসে উঠে বলল,তুমি খুব সুন্দর।
পছন্দ হয়েছে?
খুউব পছন্দ হয়েছে।
আমি কে কোথায় থাকি কি করি জানতে ইচ্ছে হয়না?
তুমি এমা তোমার মুখে কোনো মালিন্য নেই মুক্তোঝরা হাসি আর কি চাই?
এমার মুখ রক্তিম হয় বলল, আপু তুমিও খুব ভালো।
ঘরে এসো প্রথম এলে একটূ মিষ্টিমুখ কোরে যাও। বিদিশা ঘরে নিয়ে বসালো এমাকে।
এমা বিছানায় শায়িত বাচ্চাকে মন দিয়ে দেখতে থাকে। বিদিশা বলল,খেতে চায়না খালি ঘুমায়। এমা এ্যাটাচি খুলে প্যাড বের করে প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বলল,খাইয়ে দেখো।
তারপর ব্যাগ খুলে দুটো শাড়ি বের করে জিজ্ঞেস করে,কোনটা তোমার পছন্দ?
বিদিশা হাত দিয়ে বুঝতে পারে বেশ দামী শাড়ী বলল,দুটোই সুন্দর।
একটা তোমাকে দিলাম। আর একটা আমাকে পরিয়ে দাও।
বিদিশা দরজা বন্ধ করে এমাকে শাড়ী পরাতে থাকে এমা গভীরভাবে লক্ষ্য করে কিভাবে শাড়ী পরতে হয়। শাড়ি পরাতে পরাতে বিদিশা বলল,আমার ভাইটা ভীষণ লাজুক।
অভি লাজুক?
ছোটোবেলা থেকে দেখছি সামনে খাবার থাকলেও জিভ দিয়ে লালা ঝরবে কিন্তু মুখফুটে চাইতে পারে না। তুমি ওকে দেখো।
এমা কথাগুলো মনে মনে আন্দোলিত করতে থাকে। শাড়ি পরে খুব খুশি দরজা খুলে বাইরে এসে দাড়ালো।
অভি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। পরণে আগোছালো ভাবে জামদানী শাড়ী হাতে ধরা জামরুলের ডাল। হাসি পেলেও হাসেনা। এমা তার মন্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষা করছে।
গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে গেছে জামরুলের রঙ।
অভি বলল,দারুণ লাগছে। তুমি কি রাতে, এখানে থাকবে ঠিক করেছো?তোমার মম আসার কথা না?
এমা শাড়ী ছেড়ে তৈরী হয়। ডালটা হাত ছাড়া করে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে জামরুল সমেত ডালটাকে।
এটা নিয়ে যাবে নাকি?
হ্যা তোমাকে নিতে হবে না। এমা বেশ জোর দিয়ে বলল কথাটা।
অভিকে একটু সরিয়ে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল,মুনা আপু জানে?
বড় আপুকে এখনো বলিনি। কিভাবে নেবে কে জানে।
আহা মেয়েটা খারাপ কি? মুনা আপু দিন দিন যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে।
.
.
চলবে —————————
[গল্পের পর্বটি কেমন হয়েছে কমেন্ট বক্সে নিজের মতামত জানান।]