গল্পঃ "নবজন্ম" (২৫তম পর্ব)

 

গল্পঃ "নবজন্ম" (২৫তম পর্ব)
 
 
লেখকঃ আজিজুর রহমান
 
 
রাস্তার মোড় কোহিনূর ফার্মেসীতে ভীড়। একা বরুন সামলাতে পারছেন না। বাবুয়া ভজা কেউ নেই। অভি ক্যাশ সামলাচ্ছে। বাবুয়াকে বলতে হবে একজন কর্মচারী রাখা দরকার। কার্তিক মানে কেতো এখন ট্যাক্সি চালায়। বাবুয়া টাকা দিয়েছে কিছু বাকীটা ব্যাঙ্ক লোন।ফোন বাজতে অভির মুখে হাসি ফোটে। ফোন হাতে নিয়ে দেখল এমা নয়। ভেবেছিল বুঝি এমা ফোন করেছে। কানে লাগিয়ে বলল,হ্যালো?
কল্পনা বলছি চিনতে পেরেছেন?
ও হ্যা বলুন।
সবুজ ফোন করে রাগারাগি করছিল। বলছে আমি নাকি বসকে সব কথা বলেছি। অইি বুঝতে পারে কি হয়েছে বলল,আপনি কি বলেছেন?
বলেছি আমি বস-ফস কাউকে চিনিনা।
ঠিক বলেছেন। ঘটনা শোনার পর ওর বাবা মার কি প্রতিক্রিয়া কিছু বলেছে?
সে সব কিছু বলেনি। বলছিল আমার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। অভি বাবা জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
কোনো সর্বনাশ হবে না। কল্পনা আমার উপর ভরসা করতে পারেন।আপনার ক্ষতি হয় এমন কিছু করব না।
অভির কথাগুলো কল্পনাকে বিহবল করে। মুহূর্তেই নীরবতা। তারপর কল্পনা বলল, অভি আমি জানি আপনি আমার কেন কারো ক্ষতি করতে পারবেন না।
মন দিয়ে পড়াশুনা করুন। এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। কাল দেখা হলে সব বলব। রাখছি?
অভি ভাবছে এত দেরী করছে কেন বাবুয়া?বাবুয়া যথেষ্ট বুদ্ধিমান ভজাটাই একটু মাথা গরম।
বাইকের শব্দ শুনে দেখল ওরা এসে গেছে। পিছনের দরজা দিয়ে ভজা ঢুকে বলল,বস তুমি ভিতরে যাও ক্যাশ আমি দেখছি। অভি ভিতরে গেল। বাবুয়া হেসে বলল,বস তোমাকে ক্যাশ সামলাতে হচ্ছে?
কি করব একার পক্ষে বরুনের সবদিক সামলানো সম্ভব নয়।
চৌকির একপাশে বাবুয়ার ছেলে ঘুমোচ্ছে। বাবুয়া পাশে বসে।কোহিনূর চা দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে অভি জিজ্ঞেস করল, বলো কি খবর?
মাল বহুৎ সেয়ানা,ভজাকে দেখে খুব ঘাবড়ে গেছে। বাবুয়া হাসল।
কি মনে হল?
ছেলেটার মা খারাপ নয়।
একে একে সব কথা যা যা ঘটেছে সব বলল বাবুয়া। অভি মনে মনে ভাবে মায়েরা খারাপ হয়না। বলল,একটু চাপে রাখতে হবে।
কোহিনূর চায়ের কাপ নিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অভি জিজ্ঞেস করল,কিছু বলবেন?
কোহিনূর মুচকি হাসলো। বাবুয়া বলল,হাসছিস কেন?
বসের হাতে দেখো। নীল আংটি দেখিয়ে কোহিনূর বলল, এইটা কি ডাক্তার ম্যাডাম দিয়েছে?
অভি লজ্জা পেল জিজ্ঞেস করল,কি করে বুঝলেন?
এই আংটিটা ডাক্তার ম্যাডামের হাতে দেখেছিলাম। কোহিনূর বলল।
বাবুয়া বিরক্ত হয়ে বলল,একরকম দুটো হয়না?কি দেখতে কি দেখেছে। কোহিনূরের নজর এড়ায়নি বুঝতে পারে অভি। ফোন বেজে উঠল কোহিনূর বলল,ডাক্তার ম্যাডাম?
অভি ফোন ধরে হাসল। ওপাশ থেকে শোনা গেল,আমার জন্য চিন্তা হয়না?কোনো উত্তর না দিয়ে ফোন রেখে অভি বলল,বাবুয়া আমি আসছি। বরুনকে বলে একজন কর্মচারি রাখো। একা একা খদ্দের সামলানো মুস্কিল।
রাস্তায় নেমে অভি হাঁটতে থাকে। এমা খুব রেগে গেছে ওদের সামনে ফোনে সেজন্য বেশি কথা বলেনি। যত নার্সিং হোমের কাছে যাচ্ছে ভীষণ নার্ভাস বোধ করছে। এত দেরী করা বাস্তবিক ঠিক হয়নি। অভি উপরে উঠে নিজের ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করল। এমার ঘরে যাবে কিনা ভাবছে। অনেক ভেবে এমার ঘরের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল অভি।চোখ মুখ লাল সোফায় বসে আছে এমা। অভি ঢুকতে ফ্লাক্স হতে কাপে চা ঢালে।
অভি বলল,এত রাতে চা?
রাত কে করেছে?ছুটি হয়েছে যখন? এমা জিজ্ঞেস করল।
অভি কথা না বাড়িয়ে সোফায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আড়চোখে দেখতে লাগলো এমাকে।
একটা বিষয় স্পষ্ট জবাব দেবে। এমা জিজ্ঞেস করল।
অভি চোখ তুলে তাকালো এমা আবার কি জানতে চায়?মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে।
তুমি আমাকে তোমার ওয়াইফ মনে করো কি করো না?
হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?ইতিমধ্যে কিছু কি হয়েছে?এমার সামনে ঠিক সহজ হতে পারে না। গম্ভীর নামকরা ডাক্তার সামান্য হলেও বয়সে একটু বড়।
আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি। এমা মনে করিয়ে দিল।
অভি আমতা আমতা করে বলল,মানে বিয়ে এখনো হয়নি–।
ফর্মালিটিটাই আসল আর সব কিছুই নয়?
না না তা বলিনি। তুমি আমার বউ ছাড়া কি?
আমার কাছে এসে বোসো।
অভি পাশে গিয়ে বসল। এমা একটা পা সোফায় তুলে অভির দিকে ঘুরে বসল। অভি বোকার মত হাসল।
কিছু মনে কোর না। তোমার আচরণ দেখে কিন্তু তা মনে হয়না বরং মনে হয় সম্পর্কটা প্রভু-ভৃত্যের মত। আমার কষ্ট হয়। নিজেকে এ্যাসার্ট করতে শেখো। যা বলি তাই করো যা দিই তাই খাও–একী?তোমার কোনো পছন্দ-অপছন্দ থাকবে না?নিজে থেকে বউকে কখনো আদর করেছো? সব কি তোমাকে বলে বলে করাতে হবে?
অভি হেসে ফেলল। এমা অবাক হয়ে বলল,আমি একটা সিরিয়াস কথা বলছি আর তুমি হাসছো?
না মানে সত্যি কথা বলব?
তাহলে কি বানিয়ে বানিয়ে বলবে?ইচ্ছে করছে ঠাস করে একটা চড় মারি।
বিশ্বাস করো আদর করতে খুব ইচ্ছে হয় কিন্তু–।
কিন্তু কি বলো।থামলে কেন?
তোমার এত নামডাক এত বড় ডাক্তার–।
এমা খিলখিল করে হেসে উঠল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,তুমি আমার সেবা করেছিলে ভালোবাসা দিয়েছিলে তখন মনে ছিলনা বড় ডাক্তার?
তখনকার কথা আলাদা। মনে আমার শন্তি ছিল না। খালি আল্লাহকে ডাকতাম–তখন কি জানতাম তুমি ইচ্ছে করে–।
খুব সুখ খুব আনন্দ পেয়েছিলাম বলেই ঐরকম করেছিলাম। এমা হাত বাড়িয়ে অভির বুকে মাথা রেখে বলল,বোকা ছেলে তোমার কাছে আমার একটাই পরিচয় তোমার লাইফ পার্টনার। ডাক্তার ইঞ্জিনীয়ার যত বড় অফিসার বড়লোক গরীব যাইহোক সব মেয়ে আদর খেতে ভালবাসে বুঝলে বোকা?
অভির মনে এলোমেলো কত ভাবনার খেলা চলে। এমা বলল,আজ কিচ্ছু বলবো না তুমি তোমার ইচ্ছেমত আমাকে আদর করবে বুঝেছো?
অভি হেসে এমার চোখে চোখ রেখে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো।অনেক কষ্টে হাসি সম্বরন করল এমা। বাবুয়ার দল ওকে বস বলে ডাকে তারেক সাহেবের কাছে সব খবর পেয়েছে। এখন কেমন চুপটি করে শান্ত হয়ে বসে আছে যেন কিছু জানে না। বাচ্চাদের মত আদর করতে ইচ্ছে করে অভিকে। এমা মাথা তুলে বলল,যাই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।
এমা চলে যাবার পর অভি বসে ভাবতে থাকে ওর মম তাকে পছন্দ করেনা। এমাকে সেকথা বললে গুরুত্ব দেয়না হাসে। কি করছে এমা একা একা রান্নাঘরে?উঠে চুপি চুপি রান্না ঘরে উকি দিল। এমা পিছন ফিরে একটা মগে কি যেন চুমুক দিতে দিতে একটা পাত্রে মাংস কষছে। অভি পিছনে গিয়ে দাড়ালো। এমার পিছন ফিরে থাকলেও বুঝতে পারে অভির উপস্থিতি। মুখে দুষ্টু হাসি। এমার কাধে হাত রাখল অভি। এমার মনে হল একটু আগে ধমক দেওয়ায় কাজ হয়েছে। অভি জিজ্ঞেস করে,কি খাচ্ছো?
কোকো। মুখ না ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল,খাবে?
এমার হাত টেনে মগে চুমুক দিল অভি। তারপরে এমাকে জড়িয়ে ধরলো। অভির আড়ষ্টভাব কিছুটা কেটেছে। চকিতে মনে পড়ল সেই মেয়েটি কি যেন নাম? মনে পড়েছে কনক। দেখতে মেয়েটি সুদর্শনা।এক চিলতে মেঘ জমে মনে। অভি তাকে ভালবাসে তাতে সন্দেহ নেই।অসুস্থতার ভান করে বুঝেছে। পঙ্গু জেনেও পালিয়ে যাবার অজুহাত না খুঁজে আরও বেশি করে আকড়ে ধরেছিল। তাহলেও একটা বাধন দরকার। মনে মনে স্থির করে এমা এখন রেজিস্ট্রি করে রাখবে তারপর অভি পাস করলে আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানালেই হবে।মাথার উপর কেউ নেই তাকেই অভিভাবকের দায়িত্ব নিতে হবে।মহারাজ বলছিলেন বেঁচে থাকার জন্য দরকার একটা অবলম্বন।ত্রিশঙ্কূ হয়ে ভেসে বেড়ানো সম্ভব নয়। যত গতিই থাক জীবনে একটা লক্ষাভিমুখ অবশ্যই থাকতে হবে।
রান্না শেষ করে বেরিয়ে দেখল অভি নেই। টেবিলে খাবার সাজিয়ে অভির ঘরে গিয়ে দেখল ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছে অভি। এমা বলল,কথা শেষ হলে খেতে এসো। নিজের ঘরে ফিরে এসে টেবিলে বসে ভাবে এমা,দেরী করা ঠিক হবেনা। রেজিস্ট্রিটা অন্তত সেরে ফেলা আবশ্যক। সঙ্গে সঙ্গেই অভি ঢুকে টেবিলে বসল।
প্লেটে খাবার দিয়ে অভির দিকে এগিয়ে দিতে দিতে এমা বলল,তোমার কথা একজন জিজ্ঞেস করছিল।
অভি প্লেট হাতে নিয়ে বলল,তোমার পাশে বসবো?
এমা হেসে ফেলে বলল,বোসো। জিজ্ঞেস করার কি আছে।
অভি উঠে এমার পাশে বসে বলল,এখন তোমাকে ডাক্তার-ডাক্তার মনে হচ্ছে না।
কি মনে হচ্ছে?
এমাকে জড়িয়ে ধরে অভি বলল,আমার বউ।
একজন তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল তুমি কিছু বললে নাতো?
তুমি কি বললে? অভি জিজ্ঞেস করল।
আমি কি বলব? ডা.হালদারের হাসপাতালে অপারেশন শেষ করে বেরোচ্ছি এক ভদ্রমহিলা নাম বললেন কনক জিজ্ঞেস করল, অভি নামে লাইফ লাইভ নার্সিং হোমে কেউ আছে কিনা?
কনক। তুমি কি বললে?
বললাম একজন ঝাড়ুদার আছে।
অভব খাওয়া থামিয়ে হেসে উঠল। তারপর উদাস গলায় বলল,জানো এমা তখন আমার যাবার কোনো জায়গা ছিল না ঠিকই তাছাড়া আরো একটা কারণ ছিল এখানে থাকার।
ঝাড়ু দিতে বললে দিতে?
অবশ্যই কেন না রোজ তোমাকে দেখতে পাবো।
গভীর আগ্রহ নিয়ে এমা জিজ্ঞেস করে,শুধু দেখেই খুশি?
জ্ঞান হয়ে চোখ মেলতে দেখলাম তোমার মুখ। কি সুন্দর পবিত্র মন ভরে গেল। নিজেকে বোঝালাম এতেই খুশি থাকো। ইচ্ছে তো কতকিছুই হয়।
এমা খেতে খেতে ভাবে দেখে ভাল লেগেছিল তারও কিন্তু বিয়ের কথা মনে হয়নি। তারপর মহারাজের সঙ্গে আলোচনা করতে করতে কেবলি অভির কথা মনে হতো।
অভি বলল, কনক এখানে আসবে বলল।
তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে?
ফোনে বলল। কনকের জন্য খারাপ লাগে। মনোবিদ বলেছে খুব নিঃসঙ্গ জীবন কোনো অবলম্বন নেই।
বিয়ে করে নি?
বিয়ে হয়েছে কিন্তু জীবন সঙ্গী যে আড়ালে রয়ে গেছে।
মানে?
অভি বলল,তুমি যা ভাবছো তা নয়। সব খামতি পুরণ হয় যদি দুটি মন পরস্পর পরিপুরক হয় আর সমাজ তার অনূকুল হয়।
এমা বলল,আরেকটু চিকেন দিই।
দারুন হয়েছে কিন্তু ভরপেট খেতে নেই। অভি আপত্তি করল।
ফোন বাজতে এমা কানে লাগিয়ে বলল,হ্যালো?….৭২ নম্বরের পেশেণ্ট বেডে নেই?….ওহ গড! বেবী আছে?…বাথরুমে যায়নি তো?..ম্যানেজারকে খবর দিয়েছেন?আচ্ছা আসছি।
অভি জিজ্ঞেস করল,কি হয়েছে?
বাচ্চা রয়েছে মা নেই। ড.প্রিয়া কালকেই ডেলিভারি করিয়েছে।
সুনসান রাস্তা দু-ধারে বাতিস্তম্ভগুলো যেন ঝিমোচ্ছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। কদাচিৎ দু-একটা মটর গাড়ী মাঝে মধ্যে দেখা গেলেও নির্জন রাস্তায় গতি অতিশয় তীব্র। দূরে একজন মহিলা ত্রস্ত পায়ে হনহন করে চলেছে। খালি পা পরণে হালকা নীল রঙের পায়জামা একই রঙের ঢিলা জামা। মাঝে মাঝে পিছন ফিরে দেখছে।
প্রায় ঘুম হতে উঠে এসেছেন তারেক সাহেব। ঘটনা শুনে অবাক জিজ্ঞেস করলেন,ব্যাপারটা কখন বুঝলেন?
ভিজিট করতে গিয়ে নজরে পড়ল বেড খালি। ভাবলাম বুঝি বাথরুমে গিয়ে থাকবে। অনেকক্ষন অপেক্ষা করে যখন দেখলাম আসছে না গীতাকে বললাম বাথরুমে দেখতে।
মোটামুটি কত সময় হবে?
প্রায় আধঘণ্টা।
নীচে খোঁজ নিয়েছিলেন?
হ্যা স্যার কেউ কিছু দেখেনি বলল।
আধ ঘণ্টা মানে নাগালের বাইরে চলে গেছে। তারেক সাহেব নিজের মনে বললেন।
পেশেণ্টের বাড়িতে খবর নেওয়া হয়েছে?ড.এমা জিজ্ঞেস করলেন।
ফোন মনে হয় ভুয়ো নম্বর। নার্স বলল।
তারেক সাহেবের মনে হল সাধারন গৃহস্থ মহিলা নয়। নাম ভাড়িয়ে ভুল ঠিকানা দিয়ে ভর্তি হয়েছে। ড.ম্যামকে বললেন,ম্যাডাম আপনি ঘরে যান। সকালে থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি। এত লোকজন একজন উধাও হয়ে গেল কেউ কিছুই দেখল না?
কিন্তু এই বাচ্চাটা?ড.এমার বাচ্চার জন্য খারাপ লাগে।
সব দেখছি আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। তারেক সাহেব ভরসা দিলেন।
ড.এমা যাবার আগে একবার ফিমেল ওয়ার্ডে ঢুকলেন। নার্স তাকে অনুসরণ করে। সবাই ঘুমিয়ে আছে। গায়ে হালকা নীল রঙের ইউনিফররম। ড.এমা ৭২ নম্বর বেডের কাছে এসে দাড়ালেন। ড.এমা নার্সকে বললেন,ওর আলমারিটা খুলুন। নার্স আলমারি খুলল। তাতে শাড়ি পোশাক সাজানো। ড.এমা ভাবলেন,এসব নিয়ে যায়নি। নার্সকে জিজ্ঞেস করেন,দেখুন তো ভিতরে ওর ইউনিফর্ম আছে কিনা?
নার্স তন্ন তন্ন করে খুঁজে বলল,ম্যাডাম মনে হচ্ছে ইউনিফর্ম পরেই চলে গেছে।
বাইরে বেরিয়ে আসতে তারেক সাহেব এগিয়ে এলেন। ড.এমা বললেন,মনে হয় পেশেণ্ট পালাবে তার ঠিক ছিলনা। আগে থেকে ঠিক থাকলে অবশ্যই চেঞ্জ করত। হয়তো বাথরুমে বা কোনো কাজে ওয়ার্ডের বাইরে গিয়েছিল তারপর সুযোগ পেয়ে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় পালিয়েছে। আচ্ছা মি.তারেক গুড নাইট।
ড.এমা চলে যাবার পর তারেক সাহেব ভাবলেন গোয়েন্দা বুদ্ধি।নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন, পেশেণ্টের কি নাম যেন?
মিনতি মালা।
ফিরে এসে গাউন বদলে শার্ট গায়ে দিলেন এমা। মুখ গম্ভীর অভি জিজ্ঞেস করল,কোনো খারাপ খবর?
একজন পেশেণ্ট বেবিকে ফেলে পালিয়েছে।
সেকী কেউ দেখেনি? অভির গলায় উৎকণ্ঠা।
আমি ভাবছি, একজন মা তার সন্তানকে ফেলে কীভাবে পালাতে পারে?
অভি বুঝতে পারে এমার কোথায় আঘাত লেগেছে। শত হলেও সেও তো একদিন মা হবে। এমার গলা ধরে চোখে চোখ রেখে অভি বলল,মন খারাপ করেনা। সব কিছুর এক্সসেপশন থাকে কিনা বলো?
এমা ম্লান হাসলো। অভি তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তারপর মজা করে বলল,তুমি আমাকে ছেড়ে পালাবে নাতো?
যত বাজে প্রশ্ন। অভি বলল।
রাত হল এসো শুয়ে পড়ি। এমা বলল।
এলো মেলো চুল ত্রস্ত চাহনি মহিলা রাস্তার ধার ঘেষে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে চলেছে। মাঝে মাঝে সন্ত্রস্ত চোখে পিছন ফিরে দেখছে আবার হাঁটছে।ফাকা রাস্তায় বড় স্পষ্ট মনে হয়। ফাকা রাস্তা পেয়ে মাঝে মাঝে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে। বিশাল বিশাল ট্রাক। একটা ম্যাটাডোর তাকে অতিক্রম করে কিছুটা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পিছনের ডালায় দুজন মাতাল হয়ে হৈ-হই করছে।
এমা ডান কাত হয়ে শুয়েছে। পিছনে অভি কোনো সাড়া শব্দ নেই। কিছুক্ষন পর অভির দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল, অভি একটা সত্যি কথা বলবে আমাকে?
তোমাকে মিথ্যে বলা মানে নিজেকে মিথ্যে বলা।
ওই যে মেয়েটি কনক–তাকে ছেড়ে দিতে তোমার খারাপ লাগেনি?
অভি হেসে এমার গালে গাল রাখে। অভি মাথা ধরে নিজের মুখের সামনে ধরে বলল,কি জিজ্ঞেস করলাম?
কনককে তুমি ভুলতে পারছো না?
না পারছি না। তোমার মুখ হতে শুনতে চাই।
যাকে অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছি তাকে ছাড়ার প্রশ্ন কেন আসছে? এই দুনিয়ায় সবাই এক অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আছে। শুধু জানা প্রয়োজন কার বন্ধনে কতটা শক্তি আছে।
আর ইউ সিয়োর?
আমি পড়াশুনা করেছি টিউশন করে। বড় বোন ছাড়া কারো কাছে একটা পয়সা নিতে হয়নি। কনক অনেকবার টাকা দিতে চাইলেও নিতে পারিনি কিন্তু তুমিই আমার জীবনে প্রথমে যার কোনো কিছুই প্রত্যাখ্যান করতে মন সায় দেয়নি। তোমার আর কনকের অবস্থান একে অপর হতে ভিন্ন। বিশ্বাস করছো?
অভির বুকে মাথা রেখে এমা আপ্লুত হয়ে বলল,করছি–করছি-করছি।
সকাল হতেই তারেক সাহেব রেডী হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। থানায় সবাই চেনে তবু আগের থেকে জানিয়ে রাখা ভালো। প্রথম দিনই মনে হয়েছিল এরা স্বামী-স্ত্রী নয়। টাকা দিচ্ছে বাচ্চা হবে বাচ্চা নিয়ে চলে যাবে অত চিন্তার কি আছে?শালা এমনভাবে ফাসিয়ে দেবে তখন কি বুঝেছি?কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাড়ায় কে জানে।
লাইফ লাইফ নার্সিং হোমে সকাল হয়। অন্যদিনের চেয়ে এদিন অন্যরকম। তারেক সাহেব থানায় গেছেন। থানায় জানিয়ে রাখা ভাল পরে যাতে কোনো ঝামেলা না হয়। অভি খেয়ে দেয়ে প্রস্তুত,বেরোতে হবে। বেরোবার আগে এমার সঙ্গে দেখা করতে গেল প্রতিদিনের মত কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে থাকেন এমা। ফোন বাজতে অভিকে ছেড়ে দিয়ে ফোন কানে লাগিয়ে বলল,বলো মম।…..থানায় গেছেন আসুক ফোন করতে বলব….তুমি চিন্তা কোরোনা ম্যানেজার সাহেব সব দেখছেন…চোর ডাকাত নয় পালিয়ে যাবে কোথায় …কি করে জানবে….বেবির দেখভাল করছে নার্সরা,রাখছি?…মম এখন কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়… কনসিভ করেছি….হ্যা কিন্তু… এমা একবার অভির দিকে তাকিয়ে বলল, ইউনিভার্সিটি গেছে… না মম না তুমি ওকে কিছু বলবে না ওর কোনো দোষ নেই….হ্যা কিন্তু আমিই বাধ্য করেছি…… আচ্ছা এসো সব বলবো,প্লীজ মম ডোন্ট বি আপসেট …বলবো তারেক সাহেব ফিরলে ফোন করতে বলব….না কেউ জানে না…..রাখছি?….. আমাকেও বেরোতে হবে,রাখছি?
এমা ফোন রেখে দেখল চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে অভি। এমা মুচকি হেসে বলল,কি দেখছো?
কে কনসিভ করেছে?
তুমি কনসিভ করতে পারবে?
মমকে মিথ্যে বললে কেন?
আমি কি বলবো তা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি ইউনিভার্সিটি যাবে না?
আমি কিন্তু মিথ্যে বলতে পারব না বলে দিলাম। অভি গম্ভীরভাবে বলল।
মুখ টিপে হাসে এমা। অভির কাছে গিয়ে কাধের উপর হাত রেখে বলল,তুমি কনসিভ করেছো বলতে হবে না। তোমার সব দায়িত্ব আমার ঠিক আছে?
অভি নীচে নেমে দেখল পুলিশের গাড়ী। তার পিছনে একটা গাড়িতে ক্যামেরা নিয়ে কয়েকজন বোধ হয় সাংবাদিক। দ্রুত উপরে উঠে আসতে এমা বলল,তুমি ফিরে এলে?ইউনিভারসিটি গেলে না?
নীচে পুলিশ এসেছে। অভি বলল।
পুলিশ?তাতে তোমার কি হল?তুমি কি কিছু করেছো?
তোমাকে এই অবস্থায় রেখে যেতে পারব না। অভি দৃঢ়তার সঙ্গে বলল।
সত্যিই ছেলেমানুষ এমা হাসল। ফোন বাজতে এমা বলল,বলছি।…হ্যা জানি,ম্যানেজার সাহেব ফেরেন নি?…ওকে ফোন করুন…কি চায় ওরা?…..আমাকে বলবে? ….আচ্ছা আসছি ওয়েট করতে বলুন।
ফোন রেখে এমা গায়ে গাউন জড়ায়। অভি জিজ্ঞেস করল,কোথায় যাচ্ছো?
পুলিশ আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।
এমার হাত চেপে ধরে অভি বলল,আমিও যাব তোমার সঙ্গে।
এমা কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল,না আমার সঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে না। পুলিশের মুখ ভাল নয় তুমি পরে আলাদা আসতে পারো। তুমি ইউনিভার্সিটি যাবে না?
এমা চলে গেলেন। অভি বুঝতে পারে এমা কি ইঙ্গিত করল। ঠিকই এমার মর্যাদা নষ্ট হোক অভিও চায় না। একটু পরে অভিও নীচে নেমে দেখল অফিসে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছে এমা। কথাবার্তায় বোঝা গেল বাইপাসের ধারে এক মহিলার ক্ষত বিক্ষত দেহ পাওয়া গেছে।মৃতদেহের পাশে একটা জামায় লেখা আছে লাইফ লাইভ নার্সিং হোমের নাম। কথা বলতে বলতে তারেক সাহেব চলে এলেন। এসেই বকাবকি শুরু করলেন কি ব্যাপার চা-টা কিছু দেওয়া হয়নি কেন?
একজন অফিসার বললেন,আপনি কোথায় ছিলেন?
অভির মনে হল অফিসার ম্যানেজারকে চেনেন। তারেক সাহেব বললেন,আর বলবেন না কাল রাতে একজন পেশেণ্ট মিনতি মালা বাথরুম যাবার নাম করে গেল আর ফেরেনা। খোঁজ-খোঁজ কোথায় কে?লোকাল থানায় ফোন করেছিলাম এখন সেখান থেকে আসছি।সন্দেহ হচ্ছে মিনতি আসল নাম কিনা?
কেন এরকম মনে হল?
যে কনট্যাক্ট নম্বর দিয়েছিল সেটা ভূয়ো। তাছাড়া ওকে ভর্তি করার পর কেউ দেখতে আসেনি।
হুউম। ইতিমধ্যে চা এসে গেল অফিসার চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,মনে হচ্ছে সেই পেশেণ্টকে পাওয়া গেছে।
পাওয়া গেছে?আজব মহিলা কোথায় তিনি?
ময়না তদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোবাইলে ছবি দেখিয়ে বললেন,দেখুন তো ইনি সেই মিনতি মালা কিনা?
ক্ষত বিক্ষত মুখ দেখে চেনার উপায় নেই। তারেক সাহেব বললেন,আমি তো চিনতে পারব না।
গীতাকে ডাকো তো।
কাছেই ছিল গীতা। এগিয়ে আসতে তারেক সাহেব বললেন,দেখো তো ইনিই সেই মিনতি কিনা?
গীতা ঝুকে ছবিটা দেখতে দেখতে বলল,তাইতো মনে হচ্ছে।
অফিসার জিজ্ঞেস করেন,কি নাম তোমার?
গীতা ভয়ার্তমুখে ম্যানেজার সাহেবের দিকে দেখল। তারেক সাহেব বললেন,বলো নাম বলো। ভয়ের কিছু নেই।
গীতা ।
অফিসার নামটা লিখে নিলেন। তারেক সাহেব ড.এমাকে দেখিয়ে বললেন,স্যার ইনি আমাদের সার্জেন ড.এমা খন্দকার।
মালিক কে?
মালিকিন মায়নামারে থাকেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।তারেক সাহেব বললেন। ড.এমার দিকে তাকিয়ে বললেন,ম্যাডাম আপনার অপারেশন আছে না?
অফিসার বললেন,এক মিনিট। ম্যাডাম আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই। কয়েকমাস ধরে ওর পেটে একটা–।
আপনি স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন। পেশেণ্ট না দেখে কিছু বলতে পারব না।ড.এমা বললেন।
হে-হে-হে তা ঠিক। অফিসার অপ্রস্তুত বোধ করেন।
তারেক সাহেব সামাল দিতে বললেন,স্যার আপনি ম্যাডামকে নিয়ে আসুন এ্যাপয়ণ্টমেণ্ট লাগবে না। ম্যাডাম একা আসলেও অসুবিধা হবে না।
আর কিছু বলবেন?আসতে পারি? ড.এমা জিজ্ঞেস করেন।
ওহ সিয়োর। অফিসার বলল।
এমা উপরে আসতে অভি বলল,তোমার সঙ্গে আমি যাব?
আমি ব্যস্ত থাকবো একা একা তোমার কি ভাল লাগবে?ভার্সিটী যাবে না?
আজ ভাল লাগছে না। একা কোথায় তোমার কাছাকাছি থাকব। অভি বলল।
এমা বিহবল চোখে অভিকে দেখতে থাকে। হেসে বলল,চলো তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরবো।
কোলে নিতে হবে না আমি কি বাচ্চা নাকি? অভি লজ্জা পেলো।
রোহন ফিরে এল কিন্তু একা। মেয়েকে আনেনি অন্য একটি মেয়েকে নিয়ে এসেছে। ডাক্তার ম্যাডামকে সাহায্য করবে নাম কুন্তি। রোহনের মেয়ের চেয়ে বয়সে বড়। ড.এমা বললেন,জার্নি করে এলেন বিশ্রাম নিন। অভিকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
পুলিশকে বিদায় দিতে তারেক সাহেব এগিয়ে দিলেন গাড়ী পর্যন্ত।পুলিশ ভ্যানের পিছনে সাংবাদিকদের গাড়ী। পুলিশ নাম ধাম লিখে নিয়ে গেল। সাংবাদিকরাও লিখে নিল। সাদিয়া ইসলামকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করে মৃত অবস্থায় বাই পাশের ধারে কে বা কারা ফেলে রেখে গেছে। মৃত্যুর আগে যথেচ্ছ পীড়ণ করা হয়েছে। মেয়েটির পেটে এ্যালকোহল পাওয়া গেছে পুলিশের অনুমান আততায়ীরাও মদ্যপ ছিল। ফলাও করে কাগজে বেরোবে রসালো খবর তারেক সাহেব জানেন।
সাংবাদিকদেরও সেজন্য আপ্যায়িত করেছেন তিনি যাতে নার্সিং হোমের রেপুটেশনের কোনো ক্ষতি না হয়। ড.ম্যাডামের কথা বারবার জিজ্ঞেস করছিল। তারেক সাহেব বললেন, উনি এখানকার একজন চিকিৎসক। একজন সাংবাদিক বললেন, আমরা ওকে জানি। উনি নার্সিং হোমের অলঙ্কার।
গাড়িতে যেতে যেতে এমা জিজ্ঞেস করেন,মালকিনের কথা কেন জিজ্ঞেস করল?
অভি বলল,পুলিশ এতটা এল তার জন্য কিছু দক্ষিণা। তারেক সাহেব ম্যানেজ করবেন তুমি চিন্তা কোরনা।
এমা খিল খিল করে হেসে উঠে বলল,তুমি খুব দুষ্টু আছো। সঙ্গে বই নিয়ে এসেছো?ভেরি গুড সময় একদম নষ্ট করবে না।
আমাদের জীবনের নির্দিষ্ট সময় আছে। সময় নষ্ট করা মানে জীবনকে ছোটো করা।
দারুন বলেছো কথাটা।
তুমিও অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলো।
কি বই দেখি?
বইটা হাতে নিয়ে দেখলেন। জীবন নদীর চর- লেখক আজিজুর রহমান। এমার ভ্রু কুচকে যায় অভির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,কি ব্যাপার এই বই?
কলেজ স্ট্রিটে পুরানো বইয়ের দোকানে পেলাম।
জীবন নদীর চর মানে রহস্যময় মানুষদের নিয়ে লেখা। ওদের নিয়ে তোমার এত কৌতূহল কেন?
অভি হেসে বলল,কৌতূহল কিছুনা এমনি জানা। অনেক ভুল ধারণা আছে রহস্যময় মানুষ যাদের বলা হয়। তাদের জীবন নিয়ে পড়তে পড়তে বুঝতে পারছি।
এমা অবাক হয়ে অভিকে দেখতে থাকে।
ফিলিপস নার্সিং হোমে পৌঁছে ড.এমার অন্যরূপ,একেবারে ডাক্তার।অভি ওয়েটিং রুমে বই নিয়ে বসল। ড.এমা নির্দিষ্ট ঘরে যেতে একজন নার্স একটা ফাইল দিয়ে গেল। ড.এমা পেশেণ্টের কেস হিস্ট্রিতে চোখ বোলাতে থাকেন।
অভি বইয়ের মধ্যে ডুবে গেল। সময় কেটে যাচ্ছে অভির হুশ নেই।দুই-একজন করে ঢুকতে থাকে ঘরে। এদের এ্যাপয়ণ্টমেণ্ট আছে। অভির তাতে অসুবিধে হয়না। তার মন ডুবে আছে জীবনের অজ্ঞাত নানা তথ্যে। সময় গড়িয়ে চলে।
ড.এমা একটা অপারেশন সেরে বেরিয়ে ওদের দেখে ড.হালদারের ঘরে গেলেন। উনি নিজের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন। আধ ঘণ্টা পর পেশেণ্ট দেখা শুরু করবেন। ড.এমাকে দেখে বললেন,আসুন। চা খাবেন তো?
ড.এমা ইতস্তত করেন অভি এসেছে একা একা চা খাবেন?একজন বেয়ারা চা দিয়ে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,ডক্টর একজন মহিলাকে দেখলাম নাম বোধ হয় কনক। ওর সমস্যাটা কি?
ওকে চেনেন?
না না জাস্ট টাইম পাস।
ড.হালদার হাসলেন। আপনাকে বলেছিলাম সাইকোলজির একটা কোর্স করে নিন। চিকিৎসায় অনেক সহায়তা হবে।
ড.এমা হেসে বলল,সময় এত কম।
ড.হালদার বললেন,সাইকোলজি এক্স-রের মত মানুষের ভিতরটা পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়। মন অত্যন্ত গুরুত্ব পূর্ন সাইকোলজিতে।শিশু যার বোধ জন্মায়নি মাকে কাছে পেলে খুশি হয়। না পেলে কাঁদে।অর্ত্থাৎ মায়ের স্পর্শে আরাম বোধ করে। বিপরীতভাবে মা-ও আরাম বোধ করে। মনের এই আরামকে দেহের আরাম বললে অত্যুক্তি হবে না। পরবর্তি কালে বয়স হলে স্পর্শের আরেকটি মাত্রা এসে দাঁড়ায়।
ড.এমার শুনতে ভাল লাগছে। ড.হালদার বললেন,আপনি ডাক্তার আপনি জানেন এথিক্স অনুযায়ী কোনো রোগীর কথা কাউকে বলা উচিত নয়।
ড.এমা বললেন,স্যরি। আপনি ঠিকই বলেছেন। এমা উঠতে যাচ্ছিলেন ড হালদার বললেন,বসুন। আপনি আমার মেয়ের মত।ভদ্রমহিলার অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে। সমস্যা একটা হয়না তবে সমাধানের একটা উপায় হয়। নারীর জীবনে পুরুষ না হলে বা না আসলে সেজন্য নিজেকে হেয় জ্ঞান করে। এটাকে কেউ মেনে নিতে পারে আবার কেউ অস্বীকার করে পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিতে চায়। একে বলে Defence reaction.সাফল্য না পেলে আসে হতাশা। ভদ্রমহিলার মেণ্টাল লেভেল অনেক উন্নত। হয়তো উনি নিজের সম্পর্কে উচ্চ ধারণার জন্যেই স্বামীর কাছ থেকে দূরে আছেন আবার হয়তো বা কোনো কিছুর চিন্তায় নিজেকে হতাশার চাদরে আশার আলো খুঁজে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যাশায় আঘাত লাগতে অন্য কিছু বিকল্প আকড়ে ধরতে চান। আকড়ে ধরতে গিয়ে চলে গেলেন ফ্যাণ্টাসির জগতে। বাস্তবতার সঙ্গে ফ্যাণ্টাসির সামঞ্জস্য করতে গিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। যার ফলে frustration নিঃসঙ্গতা। তবে এখন অনেকটা সুস্থ বলা যায়। একটি বাচ্চা হয়েছে ওনার। সন্তান পেলে পরস্পর একটা আরাম অনুভব করবে বাঁচার একটা অর্থ খুঁজে পাবেন।
ড.এমা মাথা নীচু করে শুনছিলেন। মুখ তুলে দেখলেন ড.হালদার তার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বললেন,আপনার সময় হয়ে গেছে আমাকেও চেম্বারে বসতে হবে।
ড.এমা ঘড়ি দেখে বললেন,একদম খেয়াল ছিলনা আসি।
ড.এমা নিজের ঘরে গিয়ে নার্সকে বললেন,আমাকে বলবেন তো?
বলতে গেছিলাম ড.হালদার ইশারায় বারণ করলেন তাই চলে এসেছি।
অভি গভীরভাবে ডুবে আছে জীবনের এমন উতরায়ের বর্ণনা আর সমস্যায়। একজন এসে দাড়ালো একেবারে অভির হাঁটু ঘেষে।দাড়িয়েই আছে সরার নাম নেই চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল কনক।চোখাচুখি হতে জিজ্ঞেস করল,চিনতে পারছিস?
বারে চিনবো না কেন? অভি বই ভাজ করে বলল,বসো। তুমি এখানে?
ড.হালদারের সঙ্গে এ্যাপয়ণ্টমেণ্ট আছে। তুই?
একজনের সঙ্গে এসেছি।
তোর চেহারায় একটা ভারিক্কী ভাব এসেছে। লাইফ লাইভ নার্সিং হোমে কাজ করিস? অভি দ্বিধায় পড়ে যায় কি বলবে?কনকই বলল,সব খবর রাখি আমি।
মনে হচ্ছে কনকের রাগ আর নেই। অভি সহজভাবে হাসল। নারী সবকিছুকে সহজ করে নিতে জানে কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে তা কখনো সম্ভব কিনা অভি জানে না। কারণ পুরুষ অনেক কিছুর মাঝে নিজের অবস্থানকে নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু নারী তার মনের মানুষের অবস্থানকে নিশ্চিক করতে চাই। এখনও কনক তাকে আগের মতো করেই তুই করে সম্মোধন করছে। কিন্তু কনকের চোখের ভাষায় ভিন্ন কিছু অভি খুঁজে পাচ্ছে। কিছু যেন বলার আছে কিন্তু বলতে পারছে না। কিসের এত ভয়? সমাজের যার জন্য নিজেকে আড়াল করে রাখা?নাকি আমার ভবিষ্যত জীবনের বাঁধা না হওয়া? কনক কি তাকে বুঝতে পারে না। তার অভি কখনো এসব ভাবে না। সে যদি একবার মুখ খুলে তাহলে সে সবকিছু মেনে নিবে।
একজনের ডাক পড়তে সবাই বুঝতে পারে পেশেণ্ট দেখা শুরু হল।কনক বলল,আমার তিন নম্বর। তোর চেহারায় বেশ ঔজ্জ্বল্ল্য এসেছে।
অভি হেসে বলল,তোমার শরীর বেশ ভেঙ্গেছে। এত চিন্তা করো কেন?
চিন্তা কেউ করেনা চিন্তারাই জোর করে ঢুকে পড়ে মাথায়। পড়াশুনার কি খবর ছেড়ে দিয়েছিস?
বই দেখিয়ে বলল,এইতো পড়ছি।
ইয়ার্কি হচ্ছে শুনলাম ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাস করেছিস।
এখন এম.এ পড়ছি।
খুব ভাল খবর।
তোমার সেই কলিগ কি যেন নাম?
বনলতা।
হ্যা-হ্যা বনলতা। উনি কেমন আছেন?
বনলতা বিয়ে করেছে। ভালই আছে এখন। কনক উদাস গলায় বলল।
তুমি কেন খারাপ আছো কনক?
আমরা পরস্পর খুব ভালোবেসে ছিলাম ঠিকই কিন্তু চিন্তা চেতনায় দুজনের অনেক পার্থক্য।
অভব বুঝতে পারে আভিজাত্যের ভাবটা কনক ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। দরজায় এমাকে দেখে অভি না চাইতেও উঠে পড়ে বলল,আসি কনক?
কনক অবাক হয় এতো ড.এমা?অভি পিছন ফিরে হেসে বেরিয়ে গেল। গাড়ীতে উঠে এমা বলল,খুব পড়াশুনা করছিলে?
এমার ইঙ্গিত বুঝেও গায়ে মাখে না অভি বলল, ঐ হচ্ছে কনক।
কি বলছিল?
বলছে আমার চেহারা আরো সুন্দর হয়েছে।
এমনি-এমনি হয়েছে?এমা উইণ্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলল।
তোমার জন্য হয়েছে।
এমা খিলখিল করে হেসে উঠে বলল,তুমি মেয়ে পটাতে ওস্তাদ।
ড.হালদারের কথাটা মনে পড়ল মা সন্তানকে স্পর্শ করে মনের আরাম অনুভব করে। স্পর্শ মনের মাঝে সুখের সঞ্চার করে থাকে যদি তা মনের মানুষের বা কাছের কেউ হয়ে থাকে। হাত বাড়িয়ে অভির হাত টেনে নিয়ে বলল,কাছে এসো।
অভি কাছে ঘেষে বসল। এমাকে আজ চেম্বারে বসতে হবে। ফোন বেজে উঠতে এমা হাতে ফোন নিয়ে দেখে কেটে দিয়ে বললেন,খালি খালি আজ কামাই করলে? কিছুক্ষন পর বলল, রহস্যময় মানুষ খুবই গম্ভীর হয় প্রকৃতির হয়ে থাকে।
অভি হাসলো।
হাসলে কেন?ভুল বলেছি?
আমার জানতে ইচ্ছে হয় ওদের মানসিক গড়ণ। সমস্ত জীব পশু পাখি কীট পতঙ্গ এমন কি গাছও তাদের যন্ত্রণা ব্যাথা প্রকাশ করতে পারে অথচ ওরা পারেনা সেজন্য ওদের মনে কি কোনো আক্ষেপ নেই?তারা কি ভাবে অন্য জীবের প্রতি কোনো ঈর্ষা আছে কিনা এইসব জানতে ইচ্ছে হয়। রহস্যময় মানুষ বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। আর তাদের জীবন আমাদের সুখেরকাঁটাকে চিনতে এবং বুঝতে সাহায্য করে।
ঘ্যাচ করে গাড়ী দাঁড়িয়ে গেল। কিছু বোঝার আগেই অভি দেখল মিমি দুহাতে তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে,তোমাকে খুব ভালবাসি আমি।
অপ্রস্তুত অভি রাস্তার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করে কেউ দেখছে কিনা?
.
.
চলবে —————————
[গল্পের পর্বটি কেমন হয়েছে কমেন্ট বক্সে নিজের মতামত জানান।]

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.