মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : আট)

 https://scontent.fdac90-1.fna.fbcdn.net/v/t1.6435-9/151496085_226397632527816_774635065230636308_n.jpg?_nc_cat=103&ccb=1-5&_nc_sid=8bfeb9&_nc_eui2=AeFiFWTo3daccuQc0BjRfu53658LgZqug3DrnwuBmq6DcDBHXrZPz8pkNmsGWnTMAKL1-RshHyJ6yH_zq7fBKdie&_nc_ohc=BnIBTxPdxPsAX_Tshfk&_nc_ht=scontent.fdac90-1.fna&oh=00_AT_MpA9I4nlLXTCQeQUKyyJzuyaqv6YxVB2VorCfSkYXiQ&oe=62780B09

 
 
গল্প : মাইন্ড ট্রাভেল (পর্ব : আট)
 
মো. ইয়াছিন
 
 
যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম, পুরো বাড়ি নিঃস্তব্ধ। রাতের অন্ধকারে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরে পা রাখতেই আঁতকে উঠলাম। বাবা কাঁচুমাচু হয়ে বসে বসে কাঁপছেন৷ কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ছে। তিনি আমাকে দেখে আরো ঘাবড়ে গেলেন। আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, 'কী হয়েছে বাবা?'
তিনি এতটাই ঘাবড়ে আছেন, আমার কথার জবাব দেওয়া তো দূর, টু-শব্দ করতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন শুধু। তার ইশারা করা পথে কয়েক পা এগোতেই কাঠের পাটাতনে পড়ে থাকা মেয়েটির নিথর দেহ চোখে পড়ল। ততক্ষণে লাল টকটাকে তাজা রক্ত কাঠের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ঘরের নিচের পাহাড়ি জমিতে পড়তে শুরু করেছে। দ্রুত ছুটে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে কাঠের পাটাতনে বসে পড়লাম। আমার হাঁটুতে মেয়েটির মাথা রাখলাম। তার পেটের ক্ষতস্থানে হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বললাম, 'কীভাবে হলো এসব?'
মেয়েটি আমার মুখে আঙুল দিয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় নীরবে বলতে শুরু করল, 'আপনাকে বলা হয়নি, আপনি আমার স্বপ্ন। এতদিন শুধু আপনাকে সরাসরি দেখার জন্য ছটফট করেছি, দিন-রাত কল্পনা করেছি। কাছে পাবার কথা ভাবিনি কখনো। তাই হয়তো আপনাকে দেখেই মরতে হচ্ছে। আফসোস, যদি একবার আপনাকে কাছে পাবার ইচ্ছে পোষণ করতাম...'
আমি কাঁদোকাঁদো গলায় বললাম, 'কিচ্ছু হবে না। কিচ্ছু হবে না আপনার...'
মেয়েটি কোনোমতে এক চিলতে হেসে বলল, 'অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। শুনুন, যদি পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারেন, আমার কবরটা অবশ্যই জিয়ারত করবেন। সময় পেলেই আমার কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াবেন। আমি অপেক্ষায় থাকব। আর হ্যাঁ, আমি বারিশ।'
আমি এবার চোখের জল ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'কীসেব কবর! বললাম তো কিচ্ছু হবে না আপনার। আমি আছি তো। এই দেখুন আমি আছি। চেয়ে দেখুন।'
মেয়েটি শেষবার চেয়ে দেখল না। শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আমার কোলে। চিরদিনের মতো ঘুম। আর জেগে উঠবে না সে। আর দেখা হবে না তার সাথে। কেন এমন হয়? সব প্রিয় জিনিস এত দ্রুত হারিয়ে যায় কেন?
আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে মেয়েটি। আমি চুপচাপ বসে আছি। চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে মেয়েটির শরীর অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। মস্তিষ্কে মরে গেলে এভাবেই দেহ অদৃশ্য হয়ে যায় কি? প্রথমে পা। তারপর হাঁটু। হাঁটু বেয়ে কোমড়। তারপর পেট, বুক, গলা। এভাবে পুরো শরীর ধোঁয়ার মতো উড়ে গেল শূন্যে।
মৃত মানুষের জন্য কোনো কিছু থেমে থাকে না। বড়জোর দু'ফোঁটা অশ্রুজল ঝেড়ে ফেলা যায়। মন খারাপ করে কিছুক্ষণ বসে থাকা যায়। এর বেশি না। আমার গল্পটাও মৃত বারিশের জন্য থেমে যাবে না।
চোখের জল মুছে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, 'কেন মারলে ওঁকে?'
বাবা অসহায়ের মতো বললেন, 'তুই তো জানিস, আমি ভীষণ ভীতু। রাত নামতেই আমার ভয় বেড়ে যায়। যদি কখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, শত চেষ্টার পরেও আর ঘুমাতে পারি না। তাই ভয়ে ভয়ে তোর পাশে গিয়ে শুয়ে থাকি। আজ সন্ধ্যার পর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ঘরের ভেতর শব্দ শুনে ছুটে এলাম। এসে দেখি কেউ নেই। তারপর আবারো কারোর পায়ের শব্দ শুনলাম। আমি ভাবলাম চোর-ডাকাত হবে। টেবিল থেকে ফল কাটার ছুরি হাতে নিতেই মেয়েটা হুট করে সামনে চলে এল। আমিও কিছু না ভেবে তার পেটে ছুরি চালিয়ে দিলাম..' বলে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
'তাই বলে জানে মেরে ফেললে?' আমি ধরা গলায় বললাম।
বাবা করুণ স্বরে বললেন, 'আমি ইচ্ছে করে মারিনি...'
পুলিশে খবর দেওয়ার প্রায় ন'মিনিটের মাথায় ক'জন পুলিশ এল। একজন বোধহয় অফিসার৷ একটু গম্ভীর টাইপ। তিনি এগিয়ে এসে বললেন, 'আপনি ফোন দিয়েছেন?'
আমি বললাম, 'হ্যাঁ।'
'খুন হয়েছে বলেছিলেন।'
'হ্যাঁ। এইযে খুনি, আপনার সামনে দাঁড়িয়ে।' বাবাকে দেখিয়ে বললাম।
'খুনটা কোথায় হয়েছে? আর কাকে খুন করা হয়েছে?'
'বারিশ নামের একটি মেয়েকে। এখানেই খুন করা হয়েছে।'
'কখন?' অফিসার ভ্রু কুঁচকে বললেন।
'কিছুক্ষণ আগে।' আমি বললাম।
'লাশটা কোথায়?'
আমি ইতস্তত করলাম। লাশটা তো গায়েব হয়ে গেছে। মস্তিষ্কে মারা গেলে হয়তো এরকমই হয়। কিন্তু আমি এখন আমার মস্তিষ্কে ভ্রমণ করছি এটা পুলিশকে বুঝাই কীভাবে?
লাশ দেখাতে না পারায় পুলিশ অফিসার হতাশ হয়ে বললেন, 'পুলিশের সময়ের মূল্য আছে। অযথা টাইম পাস করার জন্য আর কখনো ফোন দেবেন না।'
'কিন্তু একটু আগে একটা খুন হয়েছে...'
'তাহলে বলুন, লাশটা কোথায়?' অফিসার ভড়কে গেলেন। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এরা আইনের লোক। প্রমাণ ছাড়া কিছুই বিশ্বাস করবে না৷ আর আমি যে মিথ্যে বলছি না, এটা প্রমাণ করা অসম্ভব। হাতে অতটা সময় নেই। এরচে' চুপ করে থাকাই ভালো।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকায় পুলিশ অফিসার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন। তার সাথে বাকি সব পুলিশের লোক চলে গেল। আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম না। বেরিয়ে পড়লাম নতুন পথের সন্ধানে।
আলোচিত সেই কিলারের কথা শুনে বিস্ময়ে কুঁকড়ে গেলাম। কী বলছে লোকটা! তার কথা মতে, সে একজন বিজ্ঞানী। তার আবিষ্কৃত টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে লোকজন মাইন্ড ট্রাভেলে যাচ্ছে। সময়মতো ফিরে আসতে পারছে না তাই মারা যাচ্ছে। যার ফলে পুলিশের চোখে তিনি আসামি। কী আশ্চর্য! এগুলো সব আমার বাবার কথা। তাহলে কি এই লোকটাই আমার সত্যিকারের বাবা? যদি তাই হয়, এই লোকটার ছেলে হব আমি।
'এ পর্যন্ত আপনার আবিষ্কৃত ক্যাপসুল খেয়ে ক'জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে?' সময় নষ্ট না করে দ্রুত জিজ্ঞেস করলাম।
'বারো জন।' লোকটি বলল।
ও গড! বারো জনের মৃত্যুর পরেই তো আমি ক্যাপসুল খেয়েছিলাম। তার মানে আজ রাতেই আমার টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে মাইন্ড ট্রাভেলে আসার কথা!
দ্রুত বেরিয়ে এলাম। যা করার দ্রুত করতে হবে। বারো জন মৃত্যুর পর অর্থাৎ আজ রাতে ওই লোকটার ছেলে অর্থাৎ সত্যিকারের আমি বাবার ল্যাবে গিয়ে টার্ডে ক্যাপসুল খাব। যদি আমি নিজেকে ক্যাপসুল খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারি? ইয়েস! ক্যাপসুল না খেলে মাইন্ড ট্রাভেলে আসা হবে না। যার শুরু নেই তার আবার শেষ কীসের?
পৃথিবীতে বেঁচে ফিরার শেষ একটা ভরসা পেলাম। এখন যেতে হবে বাবার ল্যাবে। যে করেই হোক, সত্যিকারের আমি যেন টার্ডে ক্যাপসুল খেতে না পারি। কিন্তু ল্যাবের ভেতরে যাব কীভাবে? ওখানে তো দাঁড়োয়ান থাকবে। ওঁদের হাতে যদি ধরা পড়ে যাই, তাহলে তো সত্যিকারের আমাকে টার্ডে ক্যাপসুল খাওয়া থেকে বিরত রাখতে পারব না! না না, কোনো রকম রিস্ক নেওয়া যাবে না।
নিরুপায় হয়ে আমার খুনি বাবার সাহায্য নিতে হচ্ছে। আমাকে কিছুটা দূরে দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি পাহাড়ারত দাঁড়োয়ানদের কী যেন বললেন। ওঁরা বাধ্য ছেলের মতো ভেতরে যেতে দিলো। ভেতরে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম। কখন সত্যিকারের আমি এখানে আসব। কখন আমি তাকে টার্ডে ক্যাপসুল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাব...
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে গেছে। বাবা সিগারেট জ্বালিয়েছেন। আমি অন্ধকার ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। পৃথিবীতে থাকাকালীন যেরকম দেখেছিলাম, ঠিক সেরকমই আছে ল্যাবটা। পিসিটাও সেই আগের জায়গায়। পিসির আড়ালে রাখা সেই লকার সরিয়ে ফেললেই তো হয়! যেই ভাবা সেই কাজ। পিসি সরাতে যাচ্ছিলাম, বাবা সিগারেট শেষ করে উচ্ছিষ্ট অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলে বেরিয়ে যেতে লাগলেন। আমিও বেরিয়ে এলাম তার পিছু পিছু। অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। মাঝরাত। আমি হয়তো গতকাল টার্ডে ক্যাপসুল খেয়ে ফেলেছি। কিংবা তারও আগে।
তীব্র হতাশা নিয়ে ল্যাব থেকে বেরোলাম। অনেকটা দূর এগিয়ে এসে হঠাৎ কী যেন মনে করে পিছনে ফিরে তাকালাম। অবাক করার মতো বিষয়, একটা ছেলে দাঁড়োয়ানদের ফাঁকি দিয়ে চুপি চুপি ল্যাবের ভেতরে চলে যাচ্ছে। ছেলেটা দেখতে হুবহু আমার মতো। জামাকাপড়ও একই রকম। তাহলে কি সেই ছেলেটাই আমি?
(চলবে)



[গল্পের পুরো অংশ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে তুলনা করবেন না। মাইন্ড ট্রাভেল অর্থাৎ মন ভ্রমণ না বলে সরাসরি মস্তিষ্ক ভ্রমণ বলেছি, এরও একটি কারণ আছে।]

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.